দাস্তান-ই-ইউসুফ: আহসানুল কাসাস (শ্রেষ্ঠ কাহিনী)
[ভূমিকা: ওহী ও স্বপ্ন]
আলিফ-লাম-রা, এই কিতাবের আয়াত সুস্পস্ট,
আরবি ভাষায় কোরআন দিলাম, বুঝবে যেন ইষ্ট।
শুনাই তোমায় শ্রেষ্ঠ কাহিনী, ওহীর মাধ্যমে,
আগে তুমি জানতেনা যা, ছিল সব ভ্ৰমে।
ছোট্ট ইউসুফ বাপরে বলেন, "আব্বাজান আমার,
স্বপ্নে দেখি এগারো তারা, চাঁদ ও সূর্য আর।
সিজদা করে আমার পায়, লুটিয়ে ভূমিতে,"
ইয়াকুব বলেন, "খবরদার! বোলো না ভাইদেরে।
ফন্দি আঁটবে তারা তোমার, হিংসার অনলে,
শয়তান যে প্রকাশ্য শত্রু, ডোবাবে ছলেবলে।
আল্লাহ তোমায় বাছলেন এভাবে, শেখাবেন তাবির,
পূর্ণ হবে নেয়ামত তাঁর, যেমন দাদাদের।"
[ভাইদের ষড়যন্ত্র ও কূপের আঁধার]
ভাইরা বলে, "ইউসুফ প্রিয়, বাবার অতিশয়,
আমরা হবো শক্তিশালী, তবু তিনি রয়,
ভুলের মাঝে ডুবে আছেন, আমাদের আব্বা,
মারো ইউসুফ বা ফেলো দূরে, তবেই মিটবে জবা।"
একজন বলল, "মেরো না তাকে, ফেলো কূপের তল,
কোনো কাফেলা নিয়ে যাবে, এটাই ভালো ফল।"
বাপের কাছে আবদার করে, "কালকে যাবে সাথে,
খেলবে এবং ঘুরবে সে যে, মাঠের সীমানাতে।
আমরা তারে আগলে রাখব, ভয় পেয়ো না তুমি,"
ইয়াকুব বলেন, "বিচ্ছেদ তার, সইবে না এ ভূমি।
ভয় লাগে মোর, নেকড়ে বাঘে, যদি তারে খায়,"
তারা বলল, "আমরা থাকতে, বাঘ কি কাছে পায়?"
নিয়ে তাকে ফেলল কূপে, আল্লাহর হুকুমে,
ইউসুফ পেলেন ওহীর আলো, গভীর সেই ঘুমে।
"জানিয়ে দিবে তাদের কর্ম, বুঝবে না তারা,"
রাতে ফিরে কাঁদল ভাইরা, চোখে মিথ্যে ধারা।
রক্ত মাখা জামা দিল, "বাঘে খেয়েছে হায়!"
ইয়াকুব বলেন, "মনগড়া সব, সবর আমার উপায়।"
[দাসত্ব ও আজিজের ঘর]
কাফেলা এল, পানি তুলতে, বালতি দিল ফেলে,
"সুসংবাদ! সুন্দর এক, বালক আছে তলে।"
পণ্য ভেবে বেচল তারে, নামমাত্র দামে,
মিসর দেশে আজিজ কিনল, রাখল ভালো ধামে।
বউকে বলল, "সম্মান দিও, হয়তো কাজে দিবে,"
এভাবেই আল্লাহ ইউসুফকে, প্রতিষ্ঠিত করিবে।
যৌবন যখন এল তাঁর, জ্ঞান ও হিকমত দান,
সৎকর্মশীলদের আল্লাহ, দেন এমন সম্মান।
[জুলেখার প্রেম ও পরীক্ষা]
আজিজের স্ত্রী জুলেখা বিবি, প্রেমে পাগলপারা,
দরজা বন্ধ করে বলে, "এসো গো আমার সারা।"
ইউসুফ বলেন, "আল্লাহ বাঁচান! তিনি আমার রব,
আশ্রয়দাতা মালিক আমার, করব না এই সব।"
সে চাইল তাকে, তিনিও চাইতেন, যদি না দেখতেন 'বুরহান',
আল্লাহর বিশেষ দয়ায় তিনি, বাঁচলেন মহীয়ান।
দৌড় দিলেন দরজার পানে, ছিঁড়ল জামা পিছে,
স্বামী ছিল দুয়ারে খাড়া, সব ধরা পড়ল নিচে।
জুলেখা বলে, "জেল বা সাজা, এটাই তার পাওনা,"
ইউসুফ বলেন, "সে-ই ডেকেছে, মিথ্যা আমার গাওনা।"
সাক্ষী দিল পরিবারের, "সামনে ছেঁড়া যদি,
নারী সত্য; পিছে ছেঁড়া, নারী মিথ্যাবাদী।"
পিছে ছেঁড়া দেখে আজিজ, বলল, "নারীর ছল,
ইউসুফ তুমি ভুলো এসব, নারী তুমি মাফ বল।"
[নারীদের ভোজ ও জেলখানা]
শহরে রটল নিন্দার ঝড়, জুলেখা দিল দাওয়াত,
নারীদের হাতে ছুরি দিয়ে, সাজাল এক আয়াত।
ইউসুফ যখন সামনে এলেন, কাটল সবাই হাত,
"আল্লাহ মহান! মানুষ না এ, ফেরেশতা সাক্ষাত।"
জুলেখা বলে, "এই সেই জন, মানেনি আমার কথা,
জেল হবে তার ঠিকানা এবার, যদি না দেয় সাথা।"
ইউসুফ বলেন, "জেলখানা প্রিয়, পাপের কাজের চেয়ে,
বাঁচাও প্রভু চক্রান্ত হতে, রহমতের নাও বেয়ে।"
দোয়া কবুল করলেন আল্লাহ, জেলে গেলেন তিনি,
যদিও সবাই জানত সত্য, নির্দোষ সেই ঋণী।
[জেলখানার সাথী ও তাবির]
জেলে ঢুকল দুজন যুবক, দেখল স্বপ্ন রাতে,
একজন দেখে মদ বানাচ্ছে, আঙুর পিষে হাতে।
অন্যজন দেখে মাথায় রুটি, পাখি খাচ্ছে তা,
ইউসুফ দিলেন তাবির তাদের, শোনালেন হকের কথা।
"মদ যে বানায়, সে পাবে মুক্তি, শরাব দিবে ঢেলে,
অন্যজন যে শূলে চড়বে, পাখি খাবে মাথা বিলে।"
মুক্তি পাওয়া লোককে বলেন, "বলো রাজার কাছে,"
কিন্তু শয়তান ভুলালো তাকে, বছর কেটে গেছে।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
[রাজার স্বপ্ন ও মুক্তি]
রাজা দেখল সাতটি গাভী, মোটা ও তাজা বেশ,
সাতটি রোগা গাভী তাদের, খেয়ে করছে শেষ।
সবুজ ও শুষ্ক গমের শীষ, তাবির কেহ না জানে,
মুক্তি পাওয়া সেই লোক তখন, ছুটল ইউসুফ পানে।
ইউসুফ দিলেন সমাধান, চাষ করো সাত বছর,
জমিয়ে রাখো খাদ্য শস্য, দুঃসময়ের তরে।
রাজা খুশি, ডাকল তারে, ইউসুফ কন আগে,
"জিজ্ঞেস করো নারীদের সব, সত্য কার ভাগে?"
স্বীকার করল জুলেখা বিবি, "আমিই দোষী ছিলাম,"
সত্যের জয় হলো সেদিন, ঘুচল সব বদনাম।
[ক্ষমতা ও ভাইদের আগমন]
রাজা দিল ধনাগার সব, ইউসুফেরই হাতে,
ভাইরা এল খাদ্যের খোঁজে, দুর্ভিক্ষের সেই প্রাতে।
চিনলেন তিনি ভাইদের সব, তারা চেনেনি তাকে,
বললেন, "আনো ছোট ভাইটি (বিনিয়ামিন), পরের বারের ডাকে।
না আনলে খাদ্য পাবে না," ভয় দেখালেন তিনি,
পুঁজি-কড়ি ফেরত দিলেন, কৌশলী এক ঋণী।
[বিনিয়ামিন ও চুরির অপবাদ]
বাপকে বলে ভাইরা সবাই, "ছাড়ো ছোট ভাই,"
শপথ করে নিল তারা, "ভয় যে কোনো নাই।"
ইউসুফের কাছে এল যখন, চুপি চুপি কন,
"আমিই তোমার আপন ভাই, ভেবো না আর মন।"
ফেরার পথে পানপাত্র, রাখলেন ভাইয়ের ব্যাগে,
ঘোষণা হলো, "চোর ধরেছি, রাজার মালের ভাগে।"
ভাইরা বলে, "চোর যদি হয়, গোলাম হবে সে,"
বিনিয়ামিনের ব্যাগে মিলল, আটকা পড়ল শেষে।
[আত্মপ্রকাশ ও মিলন]
হতাশ হয়ে বড় ভাইটি, রয়ে গেল সেথা,
বাপের কাছে ফিরে অন্যরা, বলল সব কথা।
ইয়াকুব কাঁদেন শোকে পাথর, চোখ হলো সাদা,
"সবর আমি করব আবার, আল্লাহ মিটাবেন ধাঁধা।"
ছেলেরা ফিরে গেল আবার, ইউসুফ দিলেন দেখা,
"আমিই ইউসুফ, এই আমার ভাই," মিলল কপালের লেখা।
ভাইরা সব লজ্জিত হলো, চাইল ক্ষমাদান,
ইউসুফ বলেন, "নেই কোনো দোষ, মাফ আজ অফুরান।
জামাটি নিয়ে বাবার মুখে, দাও তোমরা ফেলে,
দৃষ্টি আবার ফিরবে তাঁর, সব দুঃখ ঠেলে।"
[পরিবারের মিলন ও স্বপ্নের বাস্তব]
মিশর দেশে মা-বাবা এল, সিংহাসনে বসান,
সিজদা দিল এগারো ভাই, সূর্য-চাঁদ সমান।
বললেন ইউসুফ, "আব্বাজান, এই সেই স্বপ্নের ফল,
সত্য করেছেন আল্লাহ তায়ালা, দয়ায় সুশীতল।
জেল থেকে তুলে রাজা বানালেন, আনলেন মরু হতে,
শয়তান ছিল ভাইদের মাঝে, দূর হলো সব ক্ষতে।"
দোয়া করলেন, "হে দয়াময়, মরণ দিও মুসলিম,
নেককারদের সাথে রেখো, এই তো আরজিম।"
[উপসংহার]
গায়েব খবর দিলেন আল্লাহ, রাসুল তোমায় জানি,
শিক্ষণীয় এই কাহিনীতে, জ্ঞানীদের হাতছানি।
নয় বানোয়াট গল্প এটা, হেদায়েতের নূর,
মুমিনদের জন্য রহমত, কোরআন সুমধুর।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি রহিম ও রহমান...