দাস্তান-ই-দাউদ: খলিফাতুল্লাহ ও জাবুরের সুর
[সূচনা: জালুত বধ ও নবুয়ত লাভ]
তালুত রাজার লস্কর সনে, মুমিন সেনাদল,
একদিকেতে জালুত কাফের, শরীরে তার বল।
বিশাল দেহ, গর্বে তাহার কাঁপে যে জমিন,
হাঁক দিয়া কয়, "কে আছিস তোরা, আয়রে সামনে এই দিন।"
ছোট্ট কিশোর দাউদ তখন, হাতেতে গুলতি লয়,
আল্লাহর নামে ছুড়লেন পাথর, অন্তরে নাই ভয়।
কপালে বিঁধল পাথরখানি, জালুত পড়ল ঢলে,
মিথ্যাবাদীর দম্ভ চূর্ণ, সত্যের এক ফলে।
আল্লাহ দিলেন মুলক ও হিকমত, নবুয়তেরই শান,
শেকালেন তিনি যা চাইলেন, গাইলেন জয়ের গান।
পৃথিবীর বুকে দাউদ নবী, হলেন যে সর্দার,
ন্যায় বিচারের দণ্ড হাতে, খলিফা আল্লাহ্র।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি রহিম ও রহমান...
[পাহাড়, পাখি ও জাবুর কিতাব]
দিলেন আল্লাহ কিতাব 'জাবুর', হিকমতে ভরপুর,
তেলাওয়াতে দাউদ যখন, ছড়াতেন সুমধুর।
পাহাড়-পর্বত হুকুম মানে, পাখিরাও অনুগত,
সকাল-সাঁঝের বেলা তারা, হইয়া অবনত।
দাউদ নবীর কণ্ঠের সাথে, মিলাইত সুর তারা,
পাখিরা সব থামিয়ে ওড়া, হইতো মাতোয়ারা।
পাহাড়গুলো প্রতিধ্বনি দিত, আল্লাহ্র জিকিরে,
এমন সভা বসত রোজই, প্রকৃতিরই নীড়ে।
[লৌহ শিল্প ও যুদ্ধের বর্ম]
আরেক আজব কুদরত দিলেন, আল্লাহ দাউদের হাতে,
শক্ত লোহা নরম হতো, মোমের মতন তাতে।
আগুন বিনা, হাতুড়ি বিনা, লোহা দিতেন বাঁকা,
আল্লাহর এই মোজেজাতে, বিশ্ব অবাক থাকা।
শিখিয়ে দিলেন বর্ম (Coats of Mail) বানাতে, কড়ায় কড়া মেপে,
যুদ্ধে যাহে শরীর বাঁচে, শত্রুর আঘাত চেপে।
সূক্ষ্ম মাপে আংটা গেঁথে, বানাতেন তিনি সাজ,
নিজ হাতেতে কামাই করে, সারিতেন নিজের কাজ।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
[বিচারালয় ও প্রাচীর টপকানো দুই ব্যক্তি]
ইবাদতে মগ্ন দাউদ, মেহরাবে নিরালায়,
হঠাৎ দেখেন দেয়াল টপকে, দুজন লোক যে আয়।
ভীত হলেন দাউদ নবী, অচেনা আগন্তুক,
তারা বলল, "ভয় পেয়ো না, বিচার মোদের হোক।"
একজন বলে, "শুনুন ওহে, এই যে ভাইটি আমার,
নিরানব্বই দুম্বা (Ewes) তাহার, পাল যে বেশুমার।
আমার আছে একটি দুম্বা, সম্বল শুধু তাই,
সেটাও সে নিতে চায়, জোর খাটাচ্ছে ভাই।
কথার প্যাঁচে হারিয়ে আমায়, করছে সে জুলুম,
ন্যায় বিচার করুন আপনি, দিয়ে সত্য হুকুম।"
[পরীক্ষা, তওবা ও সেজদা]
শুনিয়া দাউদ দিলেন রায়, বাদীর কথার পরে,
"একের দুম্বা ছিনিয়ে নেয়া, জুলুম তোমার 'পরে।"
রায় দিয়েই বুঝলেন তিনি, এ তো এক পরীক্ষা,
আল্লাহ বুঝি নিচ্ছেন মেপে, তাঁরই সবরের শিক্ষা।
বাদী-বিবাদী কেউ তো নয়, এ যে ফেরেশতার বেশ,
লুটিয়ে পড়েন সেজদাতে তিনি, অনুতাপেতে শেষ।
ক্ষমা চাইলেন রবের তরে, ঝরাল চোখের পানি,
আল্লাহ তাকে মাফ করিলেন, কবুল করিয়া বাণী।
নৈকট্য আর উত্তম আবাস, দিলেন উপহার,
শিক্ষা দিলেন—তওবা ছাড়া উপায় নাই কাহার।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
[শস্যখেত ও সুলাইমানের প্রজ্ঞা]
আরেক দিন বিচার এল, শস্য ও মেষ পাল,
রাতের বেলা ছাগল ঢুকে, শস্যের করে কাল।
দাউদ দিলেন ফয়সালা এক, ক্ষতিপূরণ তরে,
ছাগলগুলো দিয়ে দিতে, চাষীরই খামারে।
পুত্র সুলাইমান বললেন তখন, ভিন্ন এক বিধান,
"ছাগল থাকুক চাষীর কাছে, দুগ্ধ করো পান।
ততদিন ওই ছাগলওয়ালা, ফসল ফলাবে মাঠে,
আগের মতন হলে ফসল, ছাগল ফিরবে হাটে।"
পিতা-পুত্র দুজনেই পেলেন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান,
সুলাইমানকে বুঝ দিলেন, আল্লাহ মেহেরবান।
ভিন্ন মতেও সত্য থাকে, জ্ঞানীদেরই মাঝে,
ন্যায় বিচারে দাউদ নবী, সবার সেরা সাজে।
[উপসংহার: খলিফার দায়িত্ব]
হে দাউদ! তোমাকে আমি, করেছি খলিফা ভবে,
মানুষের মাঝে বিচার করো, সত্য ন্যায়ের রবে।
প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, হইও না পথভ্রষ্ট,
ন্যায় বিচারক আল্লাহ্র প্রিয়, যদিও তা হয় কষ্ট।
লোহা যাহার হাতে নরম, পাহাড় গায় গান,
সেই দাউদও রবের ভয়ে, কম্পিত সদাক্ষণ।
শুকরিয়া আর ইবাদতে, কাটালেন সারাটি কাল,
যুগে যুগে রবে দাউদ নবীর, সোনালী এই জঞ্জাল।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি রহিম ও রহমান...