দাস্তান-ই-ইউসুফ: স্বপ্নের তাবির ও সবরের মহিমা

9:50 PM | BY ZeroDivide EDIT

দাস্তান-ই-ইউসুফ: স্বপ্নের তাবির ও সবরের মহিমা

[সূচনা: নক্ষত্রের সিজদা ও ভাইদের হিংসা]

বাবাকে বললেন ইউসুফ, "শুনুন ওগো আব্বাজান,

আজব এক স্বপ্ন দেখি, জুড়ায় আমার এই পরান।

এগারোটি নক্ষত্র আর, সূর্য-চাঁদ ওই আসমানে,

সিজদা করে আমার পায়, ভক্তিভরা সম্মানে।"

ইয়াকুব বলেন, "চুপটি থাকো, ভাইদের এটা বোলো না,

হিংসাতে জ্বলিবে তারা, করবে কত ছলনা।

শয়তান যে প্রকাশ্য শত্রু, ফন্দি আঁটে সারাক্ষণ,

আল্লাহ তোমায় বাছলেন, তুমি যে এক রত্ন-ধন।"

ভাইরা সব পরামর্শে, হিংসা করে ইউসুফে,

"বাবার আদর বেশি পায় সে, আমরা থাকি এক কোণে।

চলো তাকে ফেলি কূপে, কিংবা মারি এই দণ্ডে,

বাবার মন ফিরবে তবে, আমাদেরই এই খণ্ডে।"

[কূপের আঁধার ও রক্তমাখা জামা]

খেলার ছলে নিল তাকে, জঙ্গল পানে ভাইয়েরা,

ফেলে দিল গভীর কূপে, নিষ্ঠুর সব পামেরা।

রাতে ফিরে কান্নাকাটি, "বাঘে খেল ভাইটিকে,"

মিথ্যা রক্ত মাখল জামায়, দেখাতে সেই নথিকে।

ইয়াকুব বলেন, "মনগড়া সব, নফস দিল ধোঁকা আজ,

'সবর জামিল' ধরব আমি, আল্লাহর উপরেই কাজ।

তোমরা যা বলছ মুখে, আল্লাহ জানেন সবটাই,

তিনি ছাড়া সাহায্যকারী, আর তো আমার কেহ নাই।"

[মিশরের দাসত্ব ও আজব পরীক্ষা]

কাফেলা এক এল সেথা, পানি তুলতে বালতি দেয়,

তুলে আনল ইউসুফকে, পণ্য ভেবে বেচে দেয়।

সামান্য ক’টা দিরহামেতে, বেচল তাকে মিশরে,

আজিজ কিনল, বলল স্ত্রীকে, "রাখ যতন করে।"

যৌবনেতে ইউসুফ যখন, রূপের আভায় ঝলমল,

আজিজের স্ত্রী আসক্ত হলো, কামনারই কোলাহল।

দরজা সব বন্ধ করে, ডাকল, "এসো কাছে মোর,"

ইউসুফ বলেন, "আল্লাহর পানাহ! ভাঙব না তো বিশ্বাস ডোর।"

প্রমাণ (বুরহান) দেখালেন রব, ইউসুফ দৌড়ান দরজায়,

পিছন থেকে জামা ছিঁড়ল, স্বামী ছিল কিনারায়।

স্ত্রী বলল, "জেলে ভরো, ইজ্জত আমার নিতে চায়,"

সাক্ষী এল, "সামনে ছেঁড়া? তবে নারী সত্য গায়।

আর যদি হয় পিছে ছেঁড়া, তবে নারী মিথ্যাবাদী,"

পিছে ছেঁড়া দেখে আজিজ, বুঝল নারীর কারসাজি।

[নারীদের হাত কাটা ও জেলখানা]

শহরের সব নারীরা কয়, "ছি ছি এ কি অনাচার!"

জুলেখা দিল ভোজের দাওয়াত, হাতে ছুরি সবার।

ইউসুফ যখন সামনে এলেন, রূপ দেখে সব বেহুঁশ,

লেবু কাটতে আঙুল কাটল, হারাল তারা সব হুঁশ।

বলল তারা, "মানুষ না এ, 'মালাক কারিম' ফেরেশতা!"

জুলেখা কয়, "জেল খাটবে, না মানলে মোর চেষ্টা।"

ইউসুফ বলেন, "জেলখানা যে, অনেক প্রিয় আমার কাছে,

পাপের ডাকে সাড়া দিলে, জাহান্নাম যে পিছে আছে।"

বিনা দোষে জেল খাটলেন, ছড়াতে তৌহিদেরই ডাক,

আল্লাহর প্রেমে মগ্ন তিনি, অন্তর যার পবিত্র পাক।

[জেলসঙ্গী ও রাজার স্বপ্ন]

দুই কয়েদি স্বপ্ন দেখে, চাইল তাবির ইউসুফের,

"মদ বানাবে একজন তুমি, খাস গোলাম হবে মনিবের।

অন্যজন যে শূলে চড়বে, পাখি খাবে মাথার মগজ,"

সত্য হলো নবীর কথা, মিলল হুবহু সেই কাগজ।

রাজা দেখল সাতটি গাভী, মোটা ও তাজা শরীরে,

সাতটি রোগা গাভী এসে, খেল তাদের গিলে রে।

সবুজ সাতটি গমের শীষ, আর সাতটি শুকনো বেশ,

পণ্ডিতেরা হার মানিল, বুঝল না তার আদ্যেশ।

ইউসুফ দিলেন তাবির তার, "সাত বছর হবে ফসল,

তারপরে সাত বছর খরা, শুকাবে সব রসাতল।

জমিয়ে রেখো শস্য দানা, বাঁচতে যদি চাও ভবে,"

রাজা খুশি, ডাকল তাকে, মন্ত্রী করে সগৌরবে।

নারীরা সব স্বীকার গেল, "ইউসুফ পূত-পবিত্র,"

সম্মানেতে মুক্তি পেলেন, উজ্জ্বল যার চরিত্র।

[ভাইদের আগমন ও চুরির কৌশল]

দুর্ভিক্ষেতে ভাইরা এল, নিতে কিছু শস্য-দান,

চিনলেন তাদের ইউসুফ নবী, ভাঙলেন না অভিমান।

বললেন, "আনো ছোট ভাইকে, নইলে পাবে না দানা,"

বিনিয়ামিনকে আনল তারা, যদিও বাবার ছিল মানা।

ফেরার পথে ইউসুফ দিলেন, নিজের পেয়ালা ভাইয়ের ব্যাগে,

চোর বলে আটকালেন তাকে, ভাইরা সব রাগে।

আইন ছিল চোর যে হবে, গোলাম হয়ে রবে সে,

কৌশলে ভাই রাখলেন কাছে, আল্লাহ চাইলেন যে।

[ইয়াকুবের অন্ধত্ব ও মিলন]

ভাই হারাবার শোকে ইয়াকুব, কাঁদেন শুধু জারজার,

সাদা হয়ে গেল চোখ দুটি তার, দুঃখে হাহাকার।

তবু বলেন, "আশাহত হইও না রবের রহমতে,

খুঁজে দেখো ইউসুফকে, ফেরো তোমরা সেই পথে।"

ভাইরা গেল ইউসুফের কাছে, ভিক্ষা চাইল করুণায়,

"আমিই ইউসুফ," বললেন তিনি, ভাইরা কাঁপল যন্ত্রণায়।

"আজ কোনো অভিযোগ নাই, আল্লাহ করুন ক্ষমা সব,

এই জামাটা আব্বার মুখে, দিও তোমরা এইরব।"

[স্বপ্ন পূরণ ও সিজদা]

জামা পেতেই চোখের জ্যোতি, ফিরল বাবার কুদরতে,

সপরিবার মিশরে গেলেন, আনন্দেরই সুব্রতে।

মা-বাবা আর ভাইরা মিলে, সিজদা দিল ইউসুফ পায়,

বললেন তিনি, "আব্বাজান, স্বপ্ন ফলল এই ধরায়।

জেল থেকে যে তুললেন তিনি, আনলেন মরু প্রান্তর হতে,

ভাইয়ের সাথে ফিতনা ছিল, দূর হলো সব এক স্রোতে।

নিশ্চয়ই আমার রব লতিফ (সূক্ষ্মদর্শী), জানেন তিনি গোপন ভেদ,

সবরকারীর ভালোই করেন, ঘুচিয়ে সকল দাহ-খেদ।"

আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...

আল্লাহু আল্লাহু... তুমি রহিম ও রহমান...