দাস্তান-ই-খলিলুল্লাহ: ইব্রাহিম ও একত্ববাদ
[তারকা, চাঁদ ও সূর্যের বিচার: একত্ববাদের খোঁজ]
আজরের ঘরে জন্ম নিয়েও, ইব্রাহিম ‘হানিফ’,
খুঁজলেন তিনি সত্য প্রভু, অন্তরে আলিফ।
রাতের আঁধারে তারা দেখে, ভাবেন তিনি মনে,
"এই বুঝি মোর পালনকর্তা," জ্বলছে গগনে।
ডুবে গেল তারা যখন, উঠল বাঁকা চাঁদ,
ভাবলেন, "তবে এই কি প্রভু? মেটায় সব সাধ?"
চাঁদও যখন ডুবল ভোরে, সূর্য উঠল লাল,
"এই তো বড়, এই তো প্রভু," ভাবলেন সকাল।
সন্ধ্যাবেলায় সূর্য ডোবে, আঁধার নামে ভবে,
ডাক দিয়ে কন ইব্রাহিম, "শুনো মানুষ সবে!
ডুবে যে যায়, ক্ষয় আছে যার, প্রভু সে নয় কভু,
আমি তো মুখ ফিরালাম তাঁতে, যিনি সবার প্রভু।"
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি রহিম ও রহমান...
[মূর্তি ভাঙা ও নমরুদের আগুন]
বাপকে বলেন, "পূজ কেন, মাটির তৈরি পুতুল?
কথা বলে না, শুনে না সে, এ যে ভুলের ভুল।"
মানল না কেউ সত্য কথা, উৎসবের ওই দিনে,
সবাই গেল মেলায় যখন, বাদ্য আর বীণে।
ইব্রাহিম ঢুকলেন ঘরে, হাতে কুড়াল লয়ে,
ভাঙলেন সব ছোট মূর্তি, এক নিমিষেই জয়ে।
বড় মূর্তির কাঁধে তিনি, ঝুলাইলেন সেই কুড়াল,
ফিরে এসে দেখল সবাই, এ কি বাঘের আড়াল!
বলল তারা, "কে ভেঙেছে? আনো তাকে ধরে,"
ইব্রাহিম কন, "বড়কে শুধাও, কুড়াল যার ঘাড়ে।"
জবাব নাই তাদের মুখে, তবু রাগের চোটে,
আগুন জ্বালায় ইব্রাহিমকে, মারবে পোড়া লোটে।
আল্লাহ দিলেন হুকুম তখন, "আগুন তুই শোন,
শীতল হয়ে যা ইব্রাহিমের, আরাম ও শান্তিতে বোন।"
আগুনের মাঝে বাগ-বাগিচা, কুদরতেরই খেলা,
সত্যের জয়ে রক্ষা পেলেন, ইব্রাহিম একেলা।
[জীবন-মৃত্যুর তর্ক ও সূর্যের উদয়]
নমরুদ এক বাদশাহ ছিল, করত অহংকার,
"জীবন-মরণ আমার হাতে," দাবি ছিল তার।
ইব্রাহিম কন, "আমার প্রভু, সূর্য উফায় পূবে,
ক্ষমতা থাকলে পশ্চিম হতে, আনো দেখি ওবে।"
হতভম্ব হলো সে তো, মুখে নাই যে বুলি,
যুক্তি তর্কে হারল সে যে, দাম্ভিকতার খুলি।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
[ফেরেশতাদের আগমন ও সারার হাসি]
মানুষ বেশে ফেরেশতারা, এল মেহমান,
তড়িঘড়ি ভাজা বাছুর, দিলেন তিনি আন।
খাবারে হাত দেয় না তারা, ইব্রাহিম পেলেন ভয়,
বলল তারা, "ভয় পেয়ো না, সুসংবাদ আজ হয়।"
বৃদ্ধা বিবি সারা তখন, মারল গালে হাত,
হেসে বলে, "এই বয়সে, সন্তান কি উৎপাত!
বন্ধ্যা আমি, বৃদ্ধ স্বামী, এ কেমন সমাচার?"
আল্লাহর কাজে বিস্ময় নাই, সব কুদরতের সার।
ইসহাক আর ইয়াকুবের, দিলেন তারা ডাক,
আল্লাহর দান শিরোধার্য, অন্তর হলো পাক।
[লুতের জাতি ও সিজ্জিল পাথর]
ইব্রাহিম শুধায় তাদের, "যাও কোথায় ভাই?"
"লুতের কওম ধ্বংস হবে, পাপের সীমা নাই।"
ইব্রাহিম কন, "বাঁচাও তাদের," দয়ার শরীর তাঁর,
ফেরেশতারা কয়, "হুকুম অটল, ফিরবে না তো আর।"
লুতের দেশে গেল তারা, সুন্দর যুবক বেশে,
পাপিষ্ঠ সব ঘিরে ধরল, কুবুদ্ধি আর দ্বেষে।
লুত বলিলেন, "মেয়েরা আমার, পবিত্র তোমাদের,
মেহমানে অপমান কোরো না, ছেড়ো কাজ মন্দের।"
মানল না কেউ, অন্ধ হলো, গুন্ডা বদমাইশ,
শহর সুদ্ধ উল্টে গেল, মিটল শয়তানি খায়েশ।
'সিজ্জিল' বা পোড়া মাটির, পাথর বর্ষণ হলো,
পাপের নগরী ধ্বংসস্তূপে, হারিয়ে সব গেল।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
[মহাপরীক্ষা: ইসমাইল ও কোরবানি]
স্বপ্নে দেখেন ইব্রাহিম, আল্লাহর হুকুম এল,
"প্রিয় বস্তু কোরবানি দাও," অন্তরে কি পেল?
বার্ধক্যের ধন ইসমাইল, প্রাণের অধিক প্রিয়,
আল্লাহ চান তারই জান, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হিয়ো।
পুত্ৰ বলে, "বাবা তুমি, কেন কর দেরি?
আল্লাহর হুকুম পালন কর, আমি ধৈর্য ধরি।"
মিনা প্রান্তরে বাপ-বেটাতে, চললেন এক সাথে,
শয়তান দিল ধোঁকা পথে, পাথর মারেন তাতে।
কাত করে শুয়ালেন ছেলে, গলায় ধরেন ছুরি,
আল্লাহ বলেন, "থামো ইব্রাহিম! সত্য এক জুরি।
স্বপ্নে তুমি সত্য ছিলে, পরীক্ষা হলো শেষ,
দুম্বা দিলাম বদলা হিসেবে, জান্নাতী আবেশ।"
[কাবা নির্মাণ ও দোয়া]
জনমানবহীন মক্কায়, সাফা-মারওয়ার পাশে,
রেখেছিলেন পরিবারকে, আল্লাহরই আশে।
বড় হলে ইসমাইলকে, সাথে নিয়ে তিনি,
কাবা ঘরের ভিত্তি গড়েন, দিন রজনী গিনি।
'মাকামে ইব্রাহিম'-এ, দাঁড়িয়ে করেন দোয়া,
"হে রব আমার, শহরটারে, শান্তি দিও ছোঁয়া।
ফল-ফলাদি দিও খেতে, দিও রিজিকে বরকত,
নামাজি এক জাতি দিও, দিও তোমার রহমত।"
শিখিয়ে দিলেন হজের নিয়ম, তাওয়াফ আর সাঈ,
চাইলেন এক রাসুল তিনি, বংশে যেন পাই।
সেই দোয়ায় এলেন নবী, আহমদ মোস্তফা,
ইব্রাহিমের দ্বীনকে তিনি, দিলেন পূত-সাফা।
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি মালিক সর্বশক্তিমান...
আল্লাহু আল্লাহু... তুমি রহিম ও রহমান...