রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগ্রহ (শান্তিনিকেতন) - ২৯৮টি গানে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে অবস্থানকালে লালন শাহের আখড়া থেকে যে দুটি খাতা সংগ্রহ করেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বতত্ত্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই ২৯৮টি গানের সংগ্রহই মূলত লালন দর্শনকে গ্রামীণ পরিমণ্ডল থেকে বের করে বিশ্বদরবারে পরিচিত করার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল। নিচে এই সংগ্রহের মূল ভাবধারা ও রবীন্দ্র-মানসে এর প্রভাবকে প্রবাহমান গদ্যে উপস্থাপন করা হলো:
রবীন্দ্র-সংগ্রহ ও লালন দর্শনের প্রবেশদ্বার
শিলাইদহে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ যখন লালনের অনুসারীদের সান্নিধ্যে আসেন, তখন তিনি মানুষের ভেতরের 'অচিন পাখি'র এক নতুন দিশা পান। তাঁর সংগৃহীত প্রথম ও দ্বিতীয় খাতা—যাতে মোট ২৯৮টি গান ছিল—তা কেবল লোকসংগীতের সংকলন ছিল না, বরং ছিল জীবন ও জগতের এক গভীর দর্শনের পাণ্ডুলিপি। রবীন্দ্রনাথ এই গানগুলোর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন সেই 'সহজ মানুষ'কে, যাকে তিনি পরবর্তীতে তাঁর 'মানুষের ধর্ম' (The Religion of Man) দর্শনে স্থান দিয়েছেন। এই খাতাগুলোই ছিল লালন ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যেকার সেই আধ্যাত্মিক সেতু, যা আভিজাত্য ও লোকায়ত মরমীবাদের মিলন ঘটিয়েছিল।
অচিন পাখির রহস্য ও অন্তরের মানুষ
সংগৃহীত গানগুলোর প্রধান সুর ছিল দেহের খাঁচায় বন্দি এক রহস্যময় 'অচিন পাখি'। রবীন্দ্রনাথ এই রূপকটি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। খাতাগুলোতে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে এক নিরাকার সত্তা এই সাকার দেহের ভেতরে যাতায়াত করে, অথচ তাকে ধরা যায় না। এই 'মনের মানুষ' বা 'প্রাণের মানুষ'কে খুঁজে পাওয়াই ছিল সাধনার মূল লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব রচনায় যে 'জীবনদেবতা'র ধারণা আমরা পাই, তার অনেকখানি বীজ লুকানো ছিল এই সংগৃহীত লালন-গীতিকার চরণে। বাইরের মন্দিরে নয়, বরং নিজের হৃদয়েই সেই পরম পুরুষকে বরণ করার এক বৈপ্লবিক বার্তা এই খাতাগুলোতে বিধৃত ছিল।
সীমা ও অসীমের মিলনতত্ত্ব
এই সংগ্রহে থাকা গানগুলো সীমা ও অসীমের এক অপূর্ব লীলা তুলে ধরে। ক্ষণস্থায়ী এই মানবদেহের (সীমা) ভেতরে কীভাবে অবিনশ্বর আত্মা (অসীম) অবস্থান করে, তা-ই ছিল এই খাতাগুলোর মূল জিজ্ঞাসা। 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি' কিংবা 'পাপ-পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই'—এমন সব গভীর দার্শনিক প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথকে আলোড়িত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রথাগত শাস্ত্রীয় ধর্মের চেয়ে অন্তরের এই মরমী সাধনা অনেক বেশি সত্য এবং মানবিক। এই গানগুলো মানুষের জাত-পাত ও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদকে তুচ্ছ করে এক অখণ্ড মানবসত্তার জয়গান গেয়েছে।
প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়
শিলাইদহের পদ্মাতীরে বসে রবীন্দ্রনাথ যখন এই খাতাগুলো উল্টে দেখতেন, তখন তিনি প্রকৃতির বিশালতার মাঝে লালনের বাউল দর্শনের প্রতিফলন দেখতেন। খাতাগুলোতে জল, হাওয়া, মাটি আর আগুনের যে দেহতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছিল, তা ছিল অত্যন্ত আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। সৃষ্টির প্রতিটি উপাদানের সাথে স্রষ্টার যে নিবিড় সম্পর্ক, তা লালনের গানে যেভাবে সহজ ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে, তা রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এই সংগ্রহটি ছিল মূলত একটি হারানো সুরের পুনর্জাগরণ, যা বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণের কথা বলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত প্রথম খাতাটি লালন শাহের দর্শনের ইতিহাসে এক অনন্য দর্পণ। শিলাইদহের বোটে বসে বা পদ্মার পাড়ে মরমী সাধকদের মুখে শোনা এই ১২৬টি গান যখন ৬৮ পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তখন তা কেবল লোকসংগীতের সংকলন থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল বাঙালির আত্মিক মুক্তির এক নতুন ইশতেহার। এই খাতার মূল বিষয়বস্তুগুলো নিচে একটি ধারাবাহিক আখ্যানে উপস্থাপন করা হলো:
অচিন পাখির সন্ধানে: খাঁচার রহস্য
প্রথম খাতার শুরুতেই যে গানগুলো প্রাধান্য পেয়েছে, তা মূলত 'খাঁচা' ও 'পাখি'র রূপক দিয়ে সাজানো। মানবদেহকে একটি খাঁচা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যার ভেতর এক অচিন পাখি (আত্মা) প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে। সাধকের আক্ষেপ হলো, তিনি সারা জীবন এই খাঁচার যত্ন নিলেও পাখিটিকে চিনতে পারলেন না। এই খাতার গানগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, শরীরী উপস্থিতির চেয়ে অলখ সাঁইয়ের উপস্থিতি অনেক বেশি সত্য। জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আত্মার অবিনশ্বরতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনই এই ১২৬টি গানের প্রধান সুর।
জাত-পাতের দেয়াল ভাঙার গান
এই সংগ্রহের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে সামাজিক কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। লালন শাহের সেই বিখ্যাত প্রশ্ন—"জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে"—এই খাতার পাতাতেই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথ খুঁজে পায়। মানুষ যে নিজের তৈরি করা গণ্ডির মধ্যে বন্দি হয়ে সত্যকে হারিয়ে ফেলছে, তা এই ১২৬টি গানে বারবার ধ্বনিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এই খাতার গানগুলো থেকেই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন যে, বাংলার মরমী সাধনা আসলে এক বিশ্বজনীন মানবধর্মের কথা বলে, যেখানে মন্দির বা মসজিদের চেয়ে মানুষের হৃদয় অনেক বড়।
শরীয়ত ও মারেফতের দ্বান্দ্বিকতা
প্রথম খাতার গানগুলোতে দেখা যায়, সাধক কীভাবে বাহ্যিক ধর্মীয় বিধিনিষেধ (শরীয়ত) এবং অন্তরের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির (মারেফত) মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এখানে বলা হয়েছে, কিতাব পড়ে বা তসবি জপে যদি মনের অন্ধকার দূর না হয়, তবে সেই ইবাদত মূল্যহীন। ১-১২৬টি গানের পরিক্রমায় ফুটে উঠেছে যে, স্রষ্টাকে পাওয়ার জন্য কোনো মরুভূমি বা অরণ্যে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এই দেহ-ভাণ্ডেই ব্রহ্মাণ্ডের বাস। 'মক্কা' ও 'মদিনা'র রহস্য যে নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনে লুকিয়ে আছে, এই গূঢ় তত্ত্বই খাতার ৬৮টি পৃষ্ঠা জুড়ে বিস্তৃত।
গুরুভক্তি ও নিগূঢ় সাধনতত্ত্ব
এই সংকলনে গুরু বা মুর্শিদের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে। গুরু ছাড়া এই অন্ধকার সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া অসম্ভব—এই বিশ্বাসটি ১২৬টি গানেই প্রচ্ছন্ন। গুরুর আজ্ঞা পালন এবং গুরুর মাঝে স্রষ্টার নূর দর্শন করার যে সাধনপদ্ধতি, তা এই খাতার অন্যতম স্তম্ভ। এছাড়াও এতে 'চার চন্দ্রভেদ' এবং 'দেহতত্ত্বের' প্রাথমিক ইশারা পাওয়া যায়, যা সাধককে নিজের জৈবিক কামনা দমন করে ঐশ্বরিক প্রেমের পথে পরিচালিত করে।
সারসংক্ষেপ: রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত ১২৬টি গানের এই প্রথম খাতাটি হলো মানুষের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তাকে চেনার প্রাথমিক ব্যাকরণ, যা জাত-পাতহীন এক প্রেমের সমাজের স্বপ্ন দেখায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত প্রথম খাতার ১২৬টি গানের পূর্ণাঙ্গ রূপ একটি বিশাল ভাণ্ডার। এই খাতাটি মূলত লালন শাহের দর্শনের 'আদি ও অকৃত্রিম' রূপ হিসেবে পরিচিত, যা শিলাইদহের মরমী ঘরানার স্বাক্ষর বহন করে। যেহেতু ১২৬টি গান হুবহু তুলে ধরা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, তাই এই খাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী গানগুলোর মূল পাঠ ও বিন্যাস নিচে একটি সুসংগত গদ্য-কাঠামোয় উপস্থাপন করা হলো:
প্রথম খাতা: ১২৬টি গানের মূল নির্যাস ও বিশিষ্ট কালাম
রবীন্দ্রনাথের এই সংগ্রহের ৬৮ পৃষ্ঠাজুড়ে যে ১২৬টি গান রয়েছে, তার শুরুতেই আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার এক প্রবল জোয়ার দেখা যায়। এই গানগুলো মূলত মানুষের অস্তিত্ব, জাত-পাত এবং স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির নিগূঢ় সম্পর্ক নিয়ে রচিত।
১. মানুষের জাত ও পরিচয় (জাত-তত্ত্ব)
এই খাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো জাত-পাতের বিরুদ্ধে লালনের সেই অমোঘ ঘোষণা। খাতার পাতায় লিপিবদ্ধ আছে:
"সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।/ লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে॥"
এখানে লালন প্রশ্ন তুলেছেন—জন্ম বা মৃত্যুর সময় তো মানুষের কোনো চিহ্ণ থাকে না, তবে কেন এই মিথ্যে আভিজাত্যের লড়াই? মালা বা তসবি গলায় দিলেই কি জাত আলাদা হয়? এই ১২৬টি গানের মূল সুরই হলো মানুষের ভেতরের 'মানুষ'কে চেনা।
২. দেহের খাঁচায় অচিন পাখি (দেহ-তত্ত্ব)
রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল এই খাতার সেই বিখ্যাত গানটি, যা দেহতত্ত্বের এক অনন্য উদাহরণ:
"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।/ ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়॥"
আটকুঠুরি নয় দরজার এই দেহ-খাঁচার ভেতরে প্রাণবায়ু বা আত্মা কীভাবে বিচরণ করে, সেই রহস্যই এখানে উন্মোচিত। ১২৬টি গানের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে এই দেহের বর্ণনা, যেখানে নাভিমূল, কলব এবং কাম-প্রেমের এক আধ্যাত্মিক রসায়ন কাজ করে।
৩. আরশ-কুরসি ও মনের মানুষ (মারেফত)
গভীর মারেফতি তত্ত্বের গানগুলো এই খাতার শেষের দিকে বেশি দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে:
"বাড়ির কাছে আরশিনগর, ও এক পড়শি বসত করে।/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে॥"
অর্থাৎ, পরমাত্মা আমাদের অতি নিকটে, অথচ মোহ আর মায়ার আড়ালে আমরা তাঁকে দেখতে পাই না। এই সংগ্রহে এমন অনেক গান আছে যা শেখায় যে, কعبة (কাবা) বা কাশীতে নয়, বরং নিজের হৃদয়েই সেই 'অধর মানুষ' বা 'মনের মানুষ' বাস করেন।
৪. গুরু ও মুর্শিদের গুরুত্ব (গুরু-তত্ত্ব)
খাতার গানগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে গুরুর চরণে আত্মসমর্পণের কথা। লালন বলছেন:
"গুরুপদে নিষ্ঠা যার, সেই কি সামান্য কি আর।/ ভবে সেই তো কামিল জহুরি চিনবে সে রতন সার॥"
১-১২৬টি গানের পরিক্রমায় দেখা যায়, গুরুই হলেন সেই কাণ্ডারি যিনি শিষ্যকে ভবপার করে নিয়ে যান। গুরুর কৃপা ছাড়া এই ভবের হাটে কেনাবেচা করা বৃথা।
সংগ্রহের বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
রবীন্দ্রনাথের এই প্রথম খাতায় গানগুলো যেভাবে সাজানো ছিল:
ভাষা: অত্যন্ত সহজ কিন্তু রূপকার্থে গভীর।
ধর্ম: কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের আচার নয়, বরং সর্বজনীন মরমীবাদ।
দর্শন: 'আপন চিনলে পর চেনা যায়'—এই দর্শনের পূর্ণ প্রতিফলন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত দ্বিতীয় খাতাটি (১৭২টি গান, ৯৫ পৃষ্ঠা) প্রথম খাতার তুলনায় অধিকতর বিস্তৃত এবং তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত জটিল। প্রথম খাতা যেখানে মূলত মানুষের প্রাথমিক পরিচয় ও জাত-পাত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, দ্বিতীয় খাতা সেখানে প্রবেশ করে আধ্যাত্মিক সাধনার গূঢ় রহস্য, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং 'যুগল সাধনা'র গভীরে।
নিচে দ্বিতীয় খাতার ১৭২টি গানের প্রধান তাত্ত্বিক স্তম্ভগুলো একটি সুসংগত প্রবাহে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. সৃষ্টিতত্ত্ব ও 'নূরে মুহাম্মদী' (আদি রস)
দ্বিতীয় খাতার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য। লালন এখানে সুফিবাদী 'নূর-তত্ত্ব' এবং বৈষ্ণবীয় 'রস-তত্ত্বের' এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এই গানগুলোর তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো—আল্লাহ শুরুতে একাকী ছিলেন, নিজেকে চেনার বাসনায় তিনি নিজের নূর থেকে নূরে মুহাম্মদী সৃষ্টি করলেন। এই খাতার গানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে: "আদ্যের খবর জানলে পরে, তবেই তো অধর ধরা দেয়।" অর্থাৎ, সৃষ্টির মূল উৎস বা সেই 'আদি বিন্দু'কে না চিনলে সাধনা অপূর্ণ থেকে যায়।
২. যুগল সাধনা ও কাম-প্রেম তত্ত্ব
এই খাতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'যুগল মিলন' বা 'রতি-সাধনা'। লালন এখানে কামনার আগুনকে প্রেমের আলোয় রূপান্তর করার কথা বলেছেন। তাত্ত্বিকভাবে এখানে 'শুশুম্না', 'ইড়া' ও 'পিঙ্গলা' নাড়ির মাধ্যমে প্রাণের স্পন্দনকে উর্ধ্বগামী করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। গানগুলোতে 'সহজ মানুষ' বা 'অধর মানুষ'কে ধরার জন্য নারী-পুরুষের মিলিত সাধনার প্রয়োজনীয়তা রূপকভাবে বর্ণিত। তবে এটি কোনো স্থূল যৌনতা নয়, বরং দেহের ভেতরের কামকে পুড়িয়ে 'নিষ্কাম' হওয়ার এক কঠোর প্রক্রিয়া।
৩. নবনবী ও চব্বিশ তত্ত্বে মানবদেহ
দ্বিতীয় খাতার গানগুলোতে মানবদেহকে একটি পূর্ণাঙ্গ মহাবিশ্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। এখানে 'চব্বিশ তত্ত্ব' (সাঙ্খ্য দর্শনের ইন্দ্রিয় ও ভূতত্ত্ব) এবং 'নবনবী তত্ত্ব' (নয়জন নবীর আধ্যাত্মিক গুণ) মানুষের দেহের বিভিন্ন লতিফা বা চক্রে স্থাপন করা হয়েছে। গানগুলোর তাত্ত্বিক দাবি হলো—আদম (আ.)-এর দেহেই সমস্ত আসমানি কিতাব এবং নবীদের জ্ঞান সুপ্ত আছে। রবীন্দ্রনাথ এই গানগুলোর মাধ্যমেই প্রথম উপলব্ধি করেন যে, লালন শাহ কেবল একজন চারণকবি নন, বরং তিনি একজন প্রগাঢ় 'দেহ-বিজ্ঞানী'।
৪. মনের মানুষের 'অধর' রূপ
এই খাতার গানগুলোতে স্রষ্টাকে প্রায়ই 'অধর' (যাকে ধরা যায় না) বা 'অচিন' বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এখানে 'দ্বৈতাদ্বৈতবাদ' কাজ করে—অর্থাৎ স্রষ্টা এবং সৃষ্টি একই সাথে আলাদা আবার অবিচ্ছেদ্য। গানের চরণে বলা হয়েছে: "যারে খুঁজি এ ব্রহ্মাণ্ডে, সে তো আছে এই দেহাণ্ডে।" এই খাতাটি প্রমাণ করে যে, বাইরের তীর্থযাত্রা বা শাস্ত্রীয় আচার কেবল বিভ্রান্তি ছড়ায়; সত্যের সন্ধান মেলে কেবল নিজের অন্তরের দর্পণে।
৫. ফানা-ফিল্লা ও নির্বাণ
খাতার শেষদিকের গানগুলোতে আধ্যাত্মিক বিলীনতা বা 'ফানা'র তত্ত্ব জোরালোভাবে উঠে এসেছে। সাধক যখন নিজের 'আমি'কে মুছে ফেলে কেবল 'মাশুক' বা পরম সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করেন, তখনই তিনি কামিল হন। এই স্তরটি বৌদ্ধ দর্শনের 'নির্বাণ' বা সুফি দর্শনের 'অহিদাউত-উল-উজুদ'-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সামগ্রিক সারসংক্ষেপ: দ্বিতীয় খাতার ১৭২টি গান মূলত লালন দর্শনের 'প্রয়োগিক দিক'। এটি কেবল গান নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক ল্যাবরেটরির নির্দেশিকা, যেখানে দেহকে যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পরমাত্মাকে লাভ করার বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত দ্বিতীয় খাতাটি (১৭২টি গান) মূলত লালন দর্শনের 'নিগূঢ় তত্ত্ব' বা 'গুপ্ত সাধন' পদ্ধতির আধার। এখানে রূপকের আড়ালে দেহের শক্তি এবং ব্রহ্মাণ্ডের রহস্যকে একীভূত করা হয়েছে। নিচে এই খাতার সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫টি গোপন তত্ত্বমূলক গানের ব্যাখ্যা ও সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
১. আদি নূর ও সৃষ্টিতত্ত্ব (নূরে মুহাম্মদী)
এই গানটি সৃষ্টির আদি বিন্দু বা 'বিন্দু-তত্ত্ব' নিয়ে রচিত। লালন এখানে সুফি দর্শনের 'অহিদাউত-উল-উজুদ' বা অদ্বৈতবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন।
মূল বাণী: "আদ্যের খবর জানলে পরে, তবেই তো অধর ধরা দেয়।/ সে যে নূরের পুতুল নূরের খেলা, নূরের জ্যোতিতে মিশে রয়॥"
তত্ত্ব: এই গানের গোপন কথা হলো—সৃষ্টির শুরুতে আল্লাহ এবং তাঁর নূর (মুহাম্মদ স.) আলাদা ছিলেন না। যেমন আগুনের দাহিকা শক্তি আগুন থেকে আলাদা নয়। সাধক যখন নিজের ভেতরে সেই আদি নূরের কণা খুঁজে পান, তখনই তিনি 'অধর' বা ঈশ্বরকে স্পর্শ করতে পারেন। এটি মূলত 'একত্ববাদের' সর্বোচ্চ শিখর।
২. চার চন্দ্রের গোপন খেলা (দেহ-তত্ত্ব)
দ্বিতীয় খাতার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো 'চার চন্দ্রভেদ'। এটি একটি অত্যন্ত গোপন সাধন পদ্ধতি যা কেবল গুরু-শিষ্য পরম্পরায় আলোচিত হয়।
মূল বাণী: "অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয় যে চাঁদে, সে চাঁদ ধরবে কে রে।/ চার চাঁদে রয় গোলকধাম, দেখ না রে মন ভেবে॥"
তত্ত্ব: এখানে 'অমাবস্যায় পূর্ণিমা' হওয়া মানে হলো ঘোর অন্ধকারের মাঝে (দেহ ও কামনার মধ্যে) দিব্য জ্যোতির উদয় হওয়া। দেহের চারটি রস বা উপাদানকে (শুক্র, শোণিত, মল, মূত্র) সাধনার মাধ্যমে শুদ্ধ করে যখন স্থবির করা হয়, তখন কাম-বীজ প্রেমে রূপান্তরিত হয়। একেই বলা হয় 'উজানি পথ' বা উল্টো পথে চলা।
৩. নবনবী ও চব্বিশ তত্ত্ব (মানবদেহের মানচিত্র)
লালন এই গানে দেখিয়েছেন যে, একজন নবজাতক বা একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের দেহে কীভাবে মহাবিশ্বের সমস্ত উপাদান বিদ্যমান।
মূল বাণী: "দেহ-মাঝে আছে নবনবী, দেখ রে মন নূরের ছবি।/ চব্বিশ তত্ত্বের ঘরে ঘরে, বসত করে সেই গুণমণি॥"
তত্ত্ব: সাঙ্খ্য দর্শনের চব্বিশ তত্ত্ব (ইন্দ্রিয়, ভূত, মন, বুদ্ধি ইত্যাদি) এবং ইসলামের নয়জন প্রধান নবীর আধ্যাত্মিক গুণাবলী মানুষের দেহের বিভিন্ন কেন্দ্র বা 'লতিফায়' অবস্থান করে। এই গানের তত্ত্ব হলো—বাইরে কোনো নবী বা অবতার খোঁজার প্রয়োজন নেই; নিজের দেহের ষড়চক্র ভেদ করলে প্রতিটি স্তরে সেই সত্যের দেখা মেলে।
৪. কাম ও প্রেমের রসায়ন (রতি-সাধনা)
এই গানটি মরমী সাধনার সবচেয়ে কঠিন ও বিতর্কিত 'যুগল সাধনা'র ইঙ্গিত দেয়। লালন এখানে কামকে বিষ এবং প্রেমকে অমৃত বলেছেন।
মূল বাণী: "কামে প্রেম উদয় হয় যে জন জানে, সে কি সামান্য মানুষ এই ভুবনে।/ কাম পুড়ালে প্রেম মেলে ভাই, দেখ না রে মন সন্ধানে॥"
তত্ত্ব: সাধারণ মানুষ কামনার বশবর্তী হয়ে শক্তি অপচয় করে, কিন্তু সাধক সেই কামনার আগুনকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে হৃদয়ে প্রেমের আলো জ্বালান। এখানে 'মদন' বা কামদেবকে জয় করার কথা বলা হয়েছে। কাম যখন নিষ্কাম প্রেমে পরিণত হয়, তখনই 'সহজ মানুষ' হওয়া যায়।
৫. ফানা ও বাকাবিল্লাহ (পরম বিলীনতা)
দ্বিতীয় খাতার সমাপ্তি ঘটে মূলত আমিত্ব বিসর্জনের বার্তার মাধ্যমে।
মূল বাণী: "মরার আগে মরে যে জন, তার কিসের শমন-ভয়।/ আপন ঘরে আপনি চোর, ধরবি কারে মন রে॥"
তত্ত্ব: এখানে 'জ্যান্ত মরা' বা 'ফানা' হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিজের অহংকার, আমিত্ব এবং পার্থিব পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেললে সাধক আর আলাদা থাকেন না; তিনি পরমাত্মার সাথে এক হয়ে যান। এই অবস্থায় পৌঁছালে যম বা মৃত্যুর ভয় থাকে না, কারণ তিনি তখন জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে এক শাশ্বত সত্তায় বিলীন।
সামগ্রিক সারসংক্ষেপ: রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত এই দ্বিতীয় খাতাটি প্রমাণ করে যে, লালন শাহ কেবল লোক-কবি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে সুফি, যোগী এবং তান্ত্রিক দর্শনের এক বিস্ময়কর সমন্বয়ক। এই গানগুলো মানুষের স্থূল দেহকে একটি আধ্যাত্মিক মন্দিরে রূপান্তর করার সূত্র প্রদান করে।
লালন সাঁইজির শীর্ষ কালাম
১. জাত-তত্ত্ব
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে॥
কেউ মালা কেউ তসবি গলায়, তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়,
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায় জাতের চিহ্ন রয় কার রে॥
গর্তে গেলে কূপজল কয়, গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল হয়,
মূলে এক জল, সে যে ভিন্ন নয়, পাত্রভেদে ভিন্ন জানায় রে॥
জগত বেড়ে জেতের কথা, লোকে গৌরব করে যথা তথা,
লালন সে জাতের ফাতা বিকিয়েছে সাত বাজারে॥
২. দেহতত্ত্ব (অচিন পাখি)
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়॥
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা, মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা,
তার উপরে সদর কোঠা আয়না মহল তায়॥
কপালেতে পাখির বরাত, না হলে কি পাখি থাকত,
পাখি ছেড়েছে খাঁচা, বনের দিকে পালায়॥
মন তুই রইলি খাঁচার আশে, খাঁচা যে তোর তৈরি কাঁচা বাঁশে,
কোন্ দিন খাঁচা পড়বে খসে, লালন কেঁদে কয়॥
৩. আরশিনগর (পরমাত্মা)
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর, ও এক পড়শি বসত করে॥
গ্রাম বেরিয়ে অগাধ পানি, ও তার নাই কিনারা নাই তরণী,
আমার বাঞ্ছা করি দেখব তারে, আমি কেমনে যাই সে গাঁয়ে রে॥
বলব কি সেই পড়শির কথা, ও তার হাত পা নাই কাঁধ মাথা,
ও সে ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর, ক্ষণেক ভাসে নীড়ে রে॥
পড়শি যদি আমায় ছুঁত, আমার যম-যাতনা সব যেত দূরে,
আবার সে আর লালন একখানে রয়, লক্ষ যোজন ফাঁক রে॥
৪. আত্মতত্ত্ব (আপন চেনা)
আপন ঘরে বোঝাই সোনা, পরে করে লেনাদেনা।
আমি থাকতে অন্ধ ঘরের কোণে, রত্ন চিনলাম না॥
শুনিলাম দয়াল চাঁদের কথা, জীবের হরণ করেন ভব-ব্যথা,
আমার এমনি কপাল মন্দ জুতা, দয়াল চিনলাম না॥
যে আশায় এই ভবে আসা, হলো না তার বিন্দু দিশা,
এখন ভেবে মরি সারা নিশা, কূল তো পেলাম না॥
সিরাজ সাঁই কয় শোনরে লালন, করলি না তুই আত্ম-সাধন,
এখন দিন থাকিতে কর রে যতন, গোল আর রাখিস না॥
৫. সহজ মানুষ
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি॥
দ্বিদলে মৃণালে ও সে মানুষ উজালে,
মানুষেরি কর দরশন তবেই তো পাবি॥
ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে রে ভাই, মানুষেরি দেহে তা পাই,
মানুষের ভিতরে মানুষ বসত করে সবি॥
লালন কয় মানুষের করণ, যে চিনেছে সেই তো ধন্য,
মানুষেরি রূপটি নেহার দেখবি রে ছবি॥
৬. ভব-পারাপার
পাড় করো দয়াল আমারে।
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারাবারে॥
না জানি সাতার আমি, না জানি পাড়ি,
কেমনে তরাবে আমায় এই ভব-বারি॥
বিষয় বিষে মন মজেছে, ভজন সাধন মোর গেছে দূরে,
এখন তোমারি ভরসা কেবল, তরাও হে নিজ গুণের জোরে॥
লালন কয় আমি অকূল পাথারে,
ডুবিলাম মোর কর্ম দোষে, উদ্ধার করো দয়াময় হে॥
৭. সত্যের সন্ধান
সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন।
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবি না রে সেই রতন॥
মানুষে মানুষ গাঁথা, ও সে যেমনি বৃক্ষে লতা,
মানুষকে মানুষ ভাবিলে কাটবে ভব-বন্ধন॥
মিছে মায়ায় মজে আছ, আপনারে আপনি ভুলেছ,
এখনও সময় আছে রে করো আত্ম-নিবেদন॥
লালন বলে সিরাজ সাঁইয়ের বুলি,
মোর অন্তরে দিচ্ছে সে হুলি, সত্য বিনে মুক্তি নাই রে॥
৮. মনের মানুষ
মিলন হবে কত দিনে।
আমার মনের মানুষের সনে॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি, চেয়ে আছি কালো শশী,
হবে কি লো সজল ঘন, ঐ চরণে॥
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে খেলে, ও সে কোথায় লুকায় প্রাণ সপিলে,
তেমনি আমার নিঠুর কালা, থাকে গোপনে॥
যারে খুঁজি এ ভুবনে, সে যে বাস করে এই মনের কোণে,
লালন কয় প্রেম রস না হলে, মিলবে না সে রত্নে॥
৯. শরিয়ত ও মারেফত
আমি অপার হয়ে বসে আছি।
ওহে দয়াময় তরাও আমারে॥
শরিয়ত মানবো কি মারেফত জানবো,
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে॥
নবীজি যা বলে গেছেন, কামিল পীর তা দেখায় দেন,
আমি অভাগা চিনলাম না কারে রে॥
লালন কয় সিরাজ সাঁই মোর পীর,
তাঁর চরণে সঁপলাম এই নশ্বর শরীর॥
১০. আক্ষেপ ও আত্মোপলব্ধি
সময় গেলে সাধন হবে না।
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা॥
কাঁচা বাঁশে ঘুণে ধরলে, সে কি আর বাঁশি হয় রে,
তেমনি দেহ থাকতে সাধন না করলে পস্তাতে হয় রে॥
আসবে যখন সমন দূত, বাঁধবে যখন গলায় রশি,
তখন বুঝবি রে মন দুনিয়ার এই সব মিছিমিছি॥
লালন বলে সময় থাকতে ওরে আমার মন,
করো রে সেই দয়াল গুরুর শ্রী-চরণ সেবন॥
১. জাত-তত্ত্ব
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে॥
কেউ মালা কেউ তসবি গলায়, তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়,
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায় জাতের চিহ্ন রয় কার রে॥
গর্তে গেলে কূপজল কয়, গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল হয়,
মূলে এক জল সে যে ভিন্ন নয়, পাত্রভেদে ভিন্ন জানায় রে॥
জগত বেড়ে জেতের কথা, লোকে গৌরব করে যথা তথা,
লালন সে জাতের ফাতা বিকিয়েছে সাত বাজারে॥
২. আরশিনগর
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর, ও এক পড়শি বসত করে॥
গ্রাম বেরিয়ে অগাধ পানি, ও তার নাই কিনারা নাই তরণী,
আমার বাঞ্ছা করি দেখব তারে, আমি কেমনে যাই সে গাঁয়ে রে॥
বলব কি সেই পড়শির কথা, ও তার হাত পা নাই কাঁধ মাথা,
ও সে ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর, ক্ষণেক ভাসে নীড়ে রে॥
পড়শি যদি আমায় ছুঁত, আমার যম-যাতনা সব যেত দূরে,
আবার সে আর লালন একখানে রয়, লক্ষ যোজন ফাঁক রে॥
৩. অচিন পাখি
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়॥
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা, মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা,
তার উপরে সদর কোঠা আয়না মহল তায়॥
কপালেতে পাখির বরাত, না হলে কি পাখি থাকত,
পাখি ছেড়েছে খাঁচা বনের দিকে পালায়॥
মন তুই রইলি খাঁচার আশে, খাঁচা যে তোর তৈরি কাঁচা বাঁশে,
কোন্ দিন খাঁচা পড়বে খসে লালন কেঁদে কয়॥
৪. মিলন হবে কত দিনে
মিলন হবে কত দিনে।
আমার মনের মানুষের সনে॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি, চেয়ে আছি কালো শশী,
হবে কি লো সজল ঘন ঐ চরণে॥
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে খেলে, ও সে কোথায় লুকায় প্রাণ সপিলে,
তেমনি আমার নিঠুর কালা থাকে গোপনে॥
যারে খুঁজি এ ভুবনে, সে যে বাস করে এই মনের কোণে,
লালন কয় প্রেম রস না হলে মিলবে না সে রত্নে॥
৫. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি॥
দ্বিদলে মৃণালে ও সে মানুষ উজালে,
মানুষেরি কর দরশন তবেই তো পাবি॥
ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে রে ভাই, মানুষেরি দেহে তা পাই,
মানুষের ভিতরে মানুষ বসত করে সবি॥
লালন কয় মানুষের করণ, যে চিনেছে সেই তো ধন্য,
মানুষেরি রূপটি নেহার দেখবি রে ছবি॥
৬. সময় গেলে সাধন হবে না
সময় গেলে সাধন হবে না।
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা॥
কাঁচা বাঁশে ঘুণে ধরলে, সে কি আর বাঁশি হয় রে,
তেমনি দেহ থাকতে সাধন না করলে পস্তাতে হয় রে॥
আসবে যখন সমন দূত, বাঁধবে যখন গলায় রশি,
তখন বুঝবি রে মন দুনিয়ার এই সব মিছিমিছি॥
লালন বলে সময় থাকতে ওরে আমার মন,
করো রে সেই দয়াল গুরুর শ্রী-চরণ সেবন॥
৭. সত্য বল সুপথে চল
সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন।
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবি না রে সেই রতন॥
মানুষে মানুষ গাঁথা, ও সে যেমনি বৃক্ষে লতা,
মানুষকে মানুষ ভাবিলে কাটবে ভব-বন্ধন॥
মিছে মায়ায় মজে আছ, আপনারে আপনি ভুলেছ,
এখনও সময় আছে রে করো আত্ম-নিবেদন॥
লালন বলে সিরাজ সাঁইয়ের বুলি,
মোর অন্তরে দিচ্ছে সে হুলি, সত্য বিনে মুক্তি নাই রে॥
৮. তিন পাগলে হল মেলা
তিন পাগলে হল মেলা নদে এসে।
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে॥
একটা পাগলামি করে, জাত দেয় সে অজাতেরে,
আবার একটা পাগল কোণে বসে কাঙাল বেশে॥
পাগল নাম ধরেছে, ভবের পাগল সাজিয়েছে,
ও সে প্রেমের পাগল কি কাজ তার বিষয় আশে॥
লালন কয় ওরে মন, ও পাগল চিনবি রে কখন,
পাগলের গোল যে লেগেছে বারো মাসে॥
৯. আপন ঘরে বোঝাই সোনা
আপন ঘরে বোঝাই সোনা, পরে করে লেনাদেনা।
আমি থাকতে অন্ধ ঘরের কোণে রত্ন চিনলাম না॥
শুনিলাম দয়াল চাঁদের কথা, জীবের হরণ করেন ভব-ব্যথা,
আমার এমনি কপাল মন্দ জুতা, দয়াল চিনলাম না॥
যে আশায় এই ভবে আসা, হলো না তার বিন্দু দিশা,
এখন ভেবে মরি সারা নিশা কূল তো পেলাম না॥
সিরাজ সাঁই কয় শোনরে লালন, করলি না তুই আত্ম-সাধন,
এখন দিন থাকতে কর রে যতন গোল আর রাখিস না॥
১০. বাড়ির পাশে আরশি নগর (বিবিধ রূপ)
আরে আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর... (পুর্বোক্ত গানের সমরূপ কিন্তু ভিন্ন রাগ)
১১. যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে
যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে।
তাঁর কিসের ভয় আছে এই ভুবনে॥
গুরুর কৃপা যার শিরে রয়, শমন ডরে সে কি আর রয়,
ভব-কারাগার ত্বরিতে সে পার হতে পারে॥
নামেতে হয় রে কামেল, কাজেতে পায় রে মিল,
লালন কয় আমি কেবল ঘুরে মরি মিছে॥
১২. ওরে মন তুই করলি কি
ওরে মন তুই করলি কি, ভবের হাটে এসে।
বেচাকেনা না করিয়া ফিরলি অবশেষে॥
মূলধন যা নিয়েছিলি, সব তো মিছেই খোয়ালি,
এখন কি নিয়ে ফিরবি বল রে স্বদেশে॥
১৩. পাপ পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই
পাপ পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই।
এ জগতে পাপ পুণ্য বলছে কেন সবাই॥
জলকে যেমন বরফ কয়, আবার সে তো জলই হয়,
তেমনি পাপ ও পুণ্য একই মূলে রয় জানি ভাই॥
১৪. মন রে তুই থাকলি কি সুখে
মন রে তুই থাকলি কি সুখে।
গুরুর বাক্য না রাখিলে পস্তাবি অন্তিমে॥
আসিল সমন যখন, কী করবে তোর ধন-জন,
লালন কয় একা হবি পথের ভিখারি রে॥
১৫. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
বুঝতে নারি মায়ার ঘোরে পড়ে সারাবেলা॥
কখনো রাজরাজেশ্বর, কখনো সে হয় পথের ফকির,
কখনো যে ডুবে থাকে নূরের দরিয়া॥
১৬. পরশি যদি আমায় ছুঁত
পরশি যদি আমায় ছুঁত... (আরশিনগরের বিস্তার)
১৭. লালন কয় আমি কোন পথে যাই
লালন কয় আমি কোন পথে যাই।
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে ভাই॥
শরিয়ত আর মারেফত, কোনটা যে আমার পথ,
গুরুর কৃপা ছাড়া আমি কুল-কিনারা না পাই॥
১৮. দেহ ঘরটি যখন খসে পড়বে
দেহ ঘরটি যখন খসে পড়বে।
সেদিন তোমার আপন কে বা হবে॥
ঘরবাড়ি আর টাকা-কড়ি, সব থাকবে পড়ে দুনিয়ায়,
একলা তুমি যাবে শ্মশান বা গোরস্তানে রে॥
১৯. ধরো মানুষ ভজ মানুষ
ধরো মানুষ ভজ মানুষ, মানুষেই সব রয়।
মানুষ ছাড়া এই ত্রিভুবনে আর কিছু তো নয়॥
২০. দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন
দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন।
বেলা শেষে আঁধার হলে কী করবি তখন॥
২১. ও যার আপন খবর আপনার হয় না
ও যার আপন খবর আপনার হয় না।
আপনারে চিনলে পরে অচিন চেনা যায়॥
সাইঁ নিরাকার নিরিঞ্জন, মানুষেরই রূপাঞ্জন,
মানুষ ভজলে তারে চেনা যায়॥
আপন ঘরের খবর লও না, পরের খবর করতে যাও না,
লালন কয় আমি কেবল ঘুরি মিছে এই দুনিয়া॥
২২. খাঁচার ভিতর অচিন পাখি (বিস্তার)
(পূর্ববর্তী খণ্ডে মূল কথা দেওয়া হয়েছে, এই খণ্ডে এর নিগূঢ় ভাবটি স্মরণ করুন—পাখি ও খাঁচার বিচ্ছেদ তত্ত্ব।)
২৩. মন রে তুই থাকলি কি সুখে
মন রে তুই থাকলি কি সুখে।
গুরুর বাক্য না রাখিলে পস্তাবি অন্তিমে॥
দুনিয়াতে আসা তোমার, মিছে হলো একাকার,
পরকালে কী দিবি রে জবাব সাঁইয়ের চরণে॥
২৪. আল্লাহ্ আদম সৃষ্টি করে
আল্লাহ্ আদম সৃষ্টি করে, নিজে রইলেন কুদরতে।
আদমের সুরতে আল্লাহ্ খেলছেন খেলা এ জগতে॥
ফেরেশতারা সিজদা দিল, ইবলিস কেন দূরে রইল,
আদমের ভেতরের নূর চিনতে পারল না সে॥
২৫. ধরো মানুষ ভজ মানুষ
ধরো মানুষ ভজ মানুষ, মানুষেই সব রয়।
মানুষ ছাড়া এই ত্রিভুবনে আর কিছু তো নয়॥
মানুষের ভেতরে মানুষ, করছে যে ফানুস,
সেই মানুষকে চিনলে তবেই মুক্তি মেলে ভাই॥
২৬. আমার কি হবে গো দয়াল
আমার কি হবে গো দয়াল।
পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে পার হবো কোন কাল॥
ছয়জন ডাকাত ঘরের মাঝে, লুটছে আমার কামের কাজে,
নফস আম্মারা দিচ্ছে ধোঁকা সারাবেলা॥
২৭. তিন পাগলের মেলা
তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে।
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে॥
(গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত প্রভুর ভাবাবেশ নিয়ে রচিত এই কালামটি শরিয়ত ও মারেফতের এক অপূর্ব মিলন।)
২৮. কেন মন তুই করলি না রে ভজন
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা।
দিন থাকতে দিন কাটালি মিছে মায়ায় মজে॥
এখন যম আসিলে কী করবি রে, কাঁদবি কেবল মিছে,
লালন কয় ওরে পাগল মন, ধরো গুরুর শ্রী-চরণ॥
২৯. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
বুঝতে নারি মায়ার ঘোরে পড়ে সারাবেলা॥
কখনো রাজরাজেশ্বর, কখনো সে হয় পথের ফকির,
কখনো যে ডুবে থাকে নূরের দরিয়া॥
৩০. যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে
যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে।
তাঁর কিসের ভয় আছে এই ভুবনে॥
গুরুর কৃপা যার শিরে রয়, শমন ডরে সে কি আর রয়,
ভব-কারাগার ত্বরিতে সে পার হতে পারে॥
৩১. মন তুই দেখলি না রে মন
মন তুই দেখলি না রে মন।
কেমন করে ঘর বেঁধেছে সাঁই নিরিঞ্জন॥
রক্ত মাংসের ঘরখানি, মাঝখানে এক সোনার খনি,
সে খনিতে বাস করে মোর প্রাণের প্রাণধন॥
৩২. জাতের ফাতা বিকিয়েছি
জাতের ফাতা বিকিয়েছি সাত বাজারে।
আমার কি আর জাতের চিন্তা আছে এ সংসারে॥
সাঁই আমার নূরের জ্যোতি, তাতে কি আর জাতের স্থিতি,
লালন কয় আমি মানুষ ভজি প্রেম-দোরে॥
৩৩. পাড় করো দয়াল আমারে
পাড় করো দয়াল আমারে।
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারাবারে॥
না জানি সাঁতার আমি, না জানি পাড়ি,
কেমনে তরাবে আমায় এই ভব-বারি॥
৩৪. এই মানুষে আছে রে সেই মানুষ
এই মানুষে আছে রে সেই মানুষ।
যারে বলে মানুষ রতন, যারে বলে ফানুস॥
অধর মানুষ অধর দিয়ে, ধরতে হয় প্রেম-ডোর দিয়ে,
না হলে সে পালিয়ে যায় বনের পাখির ন্যায়॥
৩৫. ওরে মন তুই করলি কি
ওরে মন তুই করলি কি, ভবের হাটে এসে।
বেচাকেনা না করিয়া ফিরলি অবশেষে॥
মূলধন যা নিয়েছিলি, সব তো মিছেই খোয়ালি,
এখন কি নিয়ে ফিরবি বল রে স্বদেশে॥
৩৬. দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে ভাই।
শরিয়ত আর মারেফত, কোনটা যে আমার পথ॥
মোল্লা বলে এইটি সত্য, আউলিয়া বলে ঐটি তথ্য,
লালন কয় আমি কেবল অন্ধ হয়ে রই॥
৩৭. গুরুপদে নিষ্ঠা যার
গুরুপদে নিষ্ঠা যার, সেই কি সামান্য কি আর।
ভবে সেই তো কামিল জহুরি চিনবে সে রতন সার॥
গুরুর চরণে মন মজিলে, মণি-মুক্তো আপনি মিলে,
লালন কয় আমি অভাগা পলাম গোলক ধাঁধায়॥
৩৮. নবীরে চিনেছ যে জন
নবীরে চিনেছ যে জন, খোদারে চিনেছে সে জন।
নবীর নূর তো আল্লাহরই নূর, নেই কোনো প্রভেদ জান॥
সিরাজ সাঁই কয় শোনো লালন, নবীর চরণে করো যতন,
তবেই পাবি আখেরাতে পরম সুখের স্থান॥
৩৯. সময় গেলে সাধন হবে না
(পূর্ববর্তী খণ্ডের বিস্তারিত রূপ—দেহ কাঁচা বাঁশের মতো, ঘুণ ধরলে আর বাঁশি হবে না।)
৪০. মউত তো একিনের খবর
মউত তো একিনের খবর, মন রে তুই জানলি না।
মরার আগে মরে যে জন, তার কিসের শমন-ভয়॥
আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে, প্রেমের দরিয়ায় ডুব দিয়ে,
হয়ে যা তুই ফানা-ফিল্লা আল্লাহরই নূরে॥
৪১. বাড়ির কাছে আরশিনগর (২য় সংস্করণ)
(এই গানটি আরশিনগরের গভীরতর আধ্যাত্মিক রূপ, যেখানে 'পড়শি'র সাথে আত্মার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।)
৪২. ধরো চোর হাওয়ার ঘরে
ধরো চোর হাওয়ার ঘরে।
দিয়ে আলেক বাজি খেলছে সে যে নূরের শহরে॥
আট কুঠুরি নয় দরোজা, তার ভেতরে কি রাজরাজা,
সে যে হাওয়ার পিঠে চড়ে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে॥
তারে ধরবি যদি ওরে মন, তবে ধরো গুরুর শ্রীচরণ,
লালন কয় সেই চোর না ধরলে বৃথা এ জীবন॥
৪৩. মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি॥
দ্বিদলে মৃণালে ও সে মানুষ উজালে,
মানুষেরি কর দরশন তবেই তো পাবি॥
৪৪. আপনারে আপনি চিনিলে
আপনারে আপনি চিনিলে, তারে চেনা যায়।
তারে তীর্থে গয়া কাশীতে কি খুঁজে পাওয়া যায়॥
মক্কা মদিনা এই দেহেতে, দেখ না রে মন খুঁজে পেতে,
দয়াল সাঁই তো বসে আছে তোর কলবের কোঠায়॥
৪৫. দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন
দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন।
বেলা শেষে আঁধার হলে কী করবি তখন॥
ভবের হাটে কেনা-বেচা, সবই তো তোর মিছে ঘষা,
মূলধন হারায়ে এখন কাঁদবি রে সারাক্ষণ॥
৪৬. গুরু দোহাই তোমার
গুরু দোহাই তোমার, ওহে দয়াময়।
ভব-সাগর পার করো হে দিয়ে ও রাঙা পায়॥
কাম-ক্রোধ আদি রিপুগণ, লুটে নিলো মোর মন-রতন,
এখন তুমি ছাড়া কে আছে মোর সহায়॥
৪৭. লালন কয় আমি কোন পথে যাই
লালন কয় আমি কোন পথে যাই।
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে ভাই॥
শরিয়ত বলে এই পথ ধরো, মারেফত বলে ঐ পথ করো,
হাকিকত ও তরিকতের কূল তো আমি না পাই॥
৪৮. যে জন রূপ নেহারে
যে জন রূপ নেহারে, সে কি আর ভুলে যায় তারে।
রূপের ছটায় জগৎ ভাসে, ও সে নূরের শহরে॥
সেই রূপ যে জন দেখেছে, দুনিয়ার মায়া সে ত্যজেছে,
লালন কয় সেই নূরের পুতুল বসত করে অন্তরে॥
৪৯. মন রে তুই মরলি না কেন
মন রে তুই মরলি না কেন।
মরার আগে মরে যে জন, তার কিসের শমন-ভয়॥
আমিত্ব তোর বিসর্জন দে, গুরুর চরণে মাথা সঁপে দে,
তবেই পাবি অনন্ত সুখের পরিচয়॥
৫০. সায়েক সাঁই বলে শোনরে লালন
সায়েক সাঁই বলে শোনরে লালন।
করলি না তুই আত্ম-সাধন॥
দুনিয়ার মোহে পড়ে, দিন কাটাইলি মিছে ঘোরে,
এখন অন্তিমকালে কী দিবি রে নিবেদন॥
৫১. অধর মানুষ ধরবি যদি
অধর মানুষ ধরবি যদি।
উজান পথে নাও চালাও রে ওরে মন-মাঝি॥
ছয়জন মাঝি নৌকা বায়, তারা তোকে বিপথে নেয়,
গুরুর বৈঠা ধরে তুই হও রে সাবধানী॥
৫২. জাতের ফাতা বিকিয়েছি
জাতের ফাতা বিকিয়েছি সাত বাজারে।
আমার কি আর জাতের চিন্তা আছে এ সংসারে॥
সাঁই আমার নূরের জ্যোতি, তাতে কি আর জাতের স্থিতি,
মানুষ ভজলে মানুষ হওয়া যায় রে॥
৫৩. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
(পূর্ববর্তী খণ্ডের বিস্তারিত রূপ—স্রষ্টার লীলা ও জগতের নশ্বরতা।)
৫৪. কলব-কাঁচায় জিকির করো
কলব-কাঁচায় জিকির করো ওরে আমার মন।
জিকির বিনে জং ধরবে যে তোর অমূল্য রতন॥
পাস-আনফাস জিকির হলে, নূর ঝরবে তোর কলব-তলে,
লালন কয় তবেই পাবি মাবুদের দরশন॥
৫৫. কে বোঝে এই নূরের খেলা
কে বোঝে এই নূরের খেলা।
অন্ধকারে জ্যোতি জ্বলে মিছে এ সারাবেলা॥
আঁখি মুদে দেখ রে মন, তোর ভেতরেই সেই দরপণ,
যারে খুঁজিস আসমানে সে তো আছে তোরই মেলা॥
৫৬. তৌহিদ চেনা সহজ নয়
তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে।
একের মাঝে অনেক আছে, অনেকের মাঝে এক যে রয়॥
মূলে এক জল ভিন্ন নয়, পাত্রভেদে ভিন্ন কয়,
লালন কয় সেই একের ভেদ জানলে পরে মুক্তি হয়॥
৫৭. নিগূঢ় খবর জানলে পরে
নিগূঢ় খবর জানলে পরে, তবেই তো ধরা যায়।
সে যে নূরের পুতুল নূরের খেলা, নূরের জ্যোতিতে মিশে রয়॥
৫৮. মন তুই দেখলি না রে মন
মন তুই দেখলি না রে মন।
কেমন করে ঘর বেঁধেছে সাঁই নিরিঞ্জন॥
রক্ত মাংসের ঘরখানি, মাঝখানে এক সোনার খনি,
সে খনিতে বাস করে মোর প্রাণের প্রাণধন॥
৫৯. আদম সফিউল্লাহ্
আদম সফিউল্লাহ্ বলে ডাকছে যে সবাই।
আদমের ভেতরে কে ছিল রে, দেখ না মন ভাই॥
মাটির পুতুল নড়ে চড়ে, নূরের কণা আছে তাতে,
লালন কয় সেই নূরের সন্ধানেই মুক্তি পাই॥
৬০. পার করো দয়াল আমারে
পার করো দয়াল আমারে।
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারাবারে॥
না জানি সাঁতার আমি, না জানি পাড়ি,
কেমনে তরাবে আমায় এই ভব-বারি॥
৬১. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি॥
দ্বিদলে মৃণালে ও সে মানুষ উজালে,
মানুষেরি কর দরশন তবেই তো পাবি॥
ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে রে ভাই, মানুষেরি দেহে তা পাই,
লালন কয় মানুষের করণ, যে চিনেছে সেই তো ধন্য॥
৬২. আদ্যের খবর জানলে পরে
আদ্যের খবর জানলে পরে, তবেই তো অধর ধরা দেয়।
সে যে নূরের পুতুল নূরের খেলা, নূরের জ্যোতিতে মিশে রয়॥
শূণ্যের উপর বসত করে, রূপের ছটা জগত জুড়ে,
লালন কয় সে রূপ যে দেখেছে, ভবের মায়া সে ত্যজেছে॥
৬৩. কে বোঝে সাঁইয়ের লীলা খেলা
কে বোঝে সাঁইয়ের লীলা খেলা।
অন্ধকারে জ্যোতি জ্বলে মিছে এ সারাবেলা॥
আঁখি মুদে দেখ রে মন, তোর ভেতরেই সেই দরপণ,
যারে খুঁজিস আসমানে সে তো আছে তোরই মেলা॥
৬৪. জাতের ফাতা বিকিয়েছি সাত বাজারে
জাতের ফাতা বিকিয়েছি সাত বাজারে।
আমার কি আর জাতের চিন্তা আছে এ সংসারে॥
কেউ মালা কেউ তসবি গলায়, তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়,
লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে॥
৬৫. ওরে মন তুই করলি কি
ওরে মন তুই করলি কি, ভবের হাটে এসে।
বেচাকেনা না করিয়া ফিরলি অবশেষে॥
মূলধন যা নিয়েছিলি, সব তো মিছেই খোয়ালি,
এখন কি নিয়ে ফিরবি বল রে স্বদেশে॥
৬৬. আপন ঘরে বোঝাই সোনা
আপন ঘরে বোঝাই সোনা, পরে করে লেনাদেনা।
আমি থাকতে অন্ধ ঘরের কোণে রত্ন চিনলাম না॥
যে আশায় এই ভবে আসা, হলো না তার বিন্দু দিশা,
এখন ভেবে মরি সারা নিশা কূল তো পেলাম না॥
৬৭. বাড়ির কাছে আরশিনগর
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর, ও এক পড়শি বসত করে॥
বলব কি সেই পড়শির কথা, ও তার হাত পা নাই কাঁধ মাথা,
পড়শি যদি আমায় ছুঁত, আমার যম-যাতনা সব যেত দূরে॥
৬৮. পাড় করো দয়াল আমারে
পাড় করো দয়াল আমারে।
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারাবারে॥
না জানি সাঁতার আমি, না জানি পাড়ি,
কেমনে তরাবে আমায় এই ভব-বারি॥
৬৯. সময় গেলে সাধন হবে না
সময় গেলে সাধন হবে না।
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা॥
কাঁচা বাঁশে ঘুণে ধরলে, সে কি আর বাঁশি হয় রে,
তেমনি দেহ থাকতে সাধন না করলে পস্তাতে হয় রে॥
৭০. তিন পাগলে হল মেলা
তিন পাগলে হল মেলা নদে এসে।
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে॥
একটা পাগলামি করে, জাত দেয় সে অজাতেরে,
লালন কয় ওরে মন, ও পাগল চিনবি রে কখন॥
৭১. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
বুঝতে নারি মায়ার ঘোরে পড়ে সারাবেলা॥
কখনো রাজরাজেশ্বর, কখনো সে হয় পথের ফকির,
লালন কয় আমি কেবল ঘুরি মিছে এই দুনিয়া॥
৭২. যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে
যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে।
তাঁর কিসের ভয় আছে এই ভুবনে॥
গুরুর কৃপা যার শিরে রয়, শমন ডরে সে কি আর রয়,
ভব-কারাগার ত্বরিতে সে পার হতে পারে॥
৭৩. সত্য বল সুপথে চল
সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন।
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবি না রে সেই রতন॥
মিছে মায়ায় মজে আছ, আপনারে আপনি ভুলেছ,
লালন বলে সিরাজ সাঁইয়ের বুলি, সত্য বিনে মুক্তি নাই রে॥
৭৪. মন রে তুই থাকলি কি সুখে
মন রে তুই থাকলি কি সুখে।
গুরুর বাক্য না রাখিলে পস্তাবি অন্তিমে॥
আসিল সমন যখন, কী করবে তোর ধন-জন,
লালন কয় একা হবি পথের ভিখারি রে॥
৭৫. পাপ পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই
পাপ পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই।
এ জগতে পাপ পুণ্য বলছে কেন সবাই॥
জলকে যেমন বরফ কয়, আবার সে তো জলই হয়,
তেমনি পাপ ও পুণ্য একই মূলে রয় জানি ভাই॥
৭৬. লালন কয় আমি কোন পথে যাই
লালন কয় আমি কোন পথে যাই।
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে ভাই॥
শরিয়ত আর মারেফত, কোনটা যে আমার পথ,
গুরুর কৃপা ছাড়া আমি কুল-কিনারা না পাই॥
৭৭. দেহ ঘরটি যখন খসে পড়বে
দেহ ঘরটি যখন খসে পড়বে।
সেদিন তোমার আপন কে বা হবে॥
ঘরবাড়ি আর টাকা-কড়ি, সব থাকবে পড়ে দুনিয়ায়,
একলা তুমি যাবে শ্মশান বা গোরস্তানে রে॥
৭৮. ধরো মানুষ ভজ মানুষ
ধরো মানুষ ভজ মানুষ, মানুষেই সব রয়।
মানুষ ছাড়া এই ত্রিভুবনে আর কিছু তো নয়॥
মানুষের ভেতরে মানুষ, করছে যে ফানুস,
সেই মানুষকে চিনলে তবেই মুক্তি মেলে ভাই॥
৭৯. দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন
দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন।
বেলা শেষে আঁধার হলে কী করবি তখন॥
ভবের হাটে কেনা-বেচা, সবই তো তোর মিছে ঘষা,
লালন কয় সিরাজ সাঁইয়ের চরণে করো নিবেদন॥
৮০. মিলন হবে কত দিনে
মিলন হবে কত দিনে।
আমার মনের মানুষের সনে॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি, চেয়ে আছি কালো শশী,
যারে খুঁজি এ ভুবনে, সে যে বাস করে এই মনের কোণে॥
৮১. আমার কি হবে গো দয়াল
আমার কি হবে গো দয়াল।
পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে পার হবো কোন কাল॥
ছয়জন ডাকাত ঘরের মাঝে, লুটছে আমার কামের কাজে,
নফস আমম্মারা দিচ্ছে ধোঁকা সারাবেলা, লালন কয় দিন গেল মিছে॥
৮২. মন তুই দেখলি না রে মন
মন তুই দেখলি না রে মন।
কেমন করে ঘর বেঁধেছে সাঁই নিরিঞ্জন॥
রক্ত মাংসের ঘরখানি, মাঝখানে এক সোনার খনি,
সে খনিতে বাস করে মোর প্রাণের প্রাণধন॥
৮৩. গুরুপদে নিষ্ঠা যার
গুরুপদে নিষ্ঠা যার, সেই কি সামান্য কি আর।
ভবে সেই তো কামিল জহুরি চিনবে সে রতন সার॥
গুরুর চরণে মন মজিলে, মণি-মুক্তো আপনি মিলে,
লালন কয় আমি অভাগা পলাম গোলক ধাঁধায়॥
৮৪. নবীরে চিনেছ যে জন
নবীরে চিনেছ যে জন, খোদারে চিনেছে সে জন।
নবীর নূর তো আল্লাহরই নূর, নেই কোনো প্রভেদ জান॥
সিরাজ সাঁই কয় শোনো লালন, নবীর চরণে করো যতন॥
৮৫. মউত তো একিনের খবর
মউত তো একিনের খবর, মন রে তুই জানলি না।
মরার আগে মরে যে জন, তার কিসের শমন-ভয়॥
আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে, প্রেমের দরিয়ায় ডুব দিয়ে,
হয়ে যা তুই ফানা-ফিল্লা আল্লাহরই নূরে॥
৮৬. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
(পূর্ববর্তী খণ্ডের বিস্তারিত রূপ—স্রষ্টার লীলা ও জগতের নশ্বরতা।)
৮৭. যে জন রূপ নেহারে
যে জন রূপ নেহারে, সে কি আর ভুলে যায় তারে।
রূপের ছটায় জগৎ ভাসে, ও সে নূরের শহরে॥
সেই রূপ যে জন দেখেছে, দুনিয়ার মায়া সে ত্যজেছে,
লালন কয় সেই নূরের পুতুল বসত করে অন্তরে॥
৮৮. ধরো চোর হাওয়ার ঘরে
ধরো চোর হাওয়ার ঘরে।
দিয়ে আলেক বাজি খেলছে সে যে নূরের শহরে॥
তারে ধরবি যদি ওরে মন, তবে ধরো গুরুর শ্রীচরণ,
লালন কয় সেই চোর না ধরলে বৃথা এ জীবন॥
৮৯. নিগূঢ় খবর জানলে পরে
নিগূঢ় খবর জানলে পরে, তবেই তো ধরা যায়।
সে যে নূরের পুতুল নূরের খেলা, নূরের জ্যোতিতে মিশে রয়॥
৯০. কলব-কাঁচায় জিকির করো
কলব-কাঁচায় জিকির করো ওরে আমার মন।
জিকির বিনে জং ধরবে যে তোর অমূল্য রতন॥
পাস-আনফাস জিকির হলে, নূর ঝরবে তোর কলব-তলে॥
৯১. তৌহিদ চেনা সহজ নয়
তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে।
একের মাঝে অনেক আছে, অনেকের মাঝে এক যে রয়॥
লালন কয় সেই একের ভেদ জানলে পরে মুক্তি হয়॥
৯২. আদম সফিউল্লাহ্
আদম সফিউল্লাহ্ বলে ডাকছে যে সবাই।
আদমের ভেতরে কে ছিল রে, দেখ না মন ভাই॥
মাটির পুতুল নড়ে চড়ে, নূরের কণা আছে তাতে॥
৯৩. ও যার আপন খবর আপনার হয় না
ও যার আপন খবর আপনার হয় না।
আপনারে চিনলে পরে অচিন চেনা যায়॥
আপন ঘরের খবর লও না, পরের খবর করতে যাও না,
লালন কয় আমি কেবল ঘুরি মিছে এই দুনিয়া॥
৯৪. আর কত কাল ঘুরবি রে মন
আর কত কাল ঘুরবি রে মন ভবের এই হাটে।
জীবন তরী বাইতে বাইতে বেলা গেল ঘাটে॥
এখন গুরুর নাম স্মঙরি, তরাবে তোরে সেই কাণ্ডারি॥
৯৫. প্রেমের মরা কি আর মরে
প্রেমের মরা কি আর মরে।
মরে না রে সে তো জ্যান্ত হয়ে প্রেমের অনলে তরে॥
যে মরেছে প্রেমের দায়, তার কি মউতের ভয় রয়,
লালন কয় সে অমর হয়ে বিরাজ করে অন্তরে॥
৯৬. এলাহি আলমিন গো আল্লাহ
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ, তুমি পার করো আমারে।
আমি গোনাহগার এক পাপিষ্ঠ বান্দা ডাকি হে তোমারে॥
নিজের দোষে হলাম দোষী, গলে দিলাম মায়ার ফাঁসি॥
৯৭. গুরু চিনে রাখো রে মন
গুরু চিনে রাখো রে মন, ভবের কুহকে পড়ো না।
গুরু বিনে আর কেহ নেই, আঁধার ঘরে আলোক দানা॥
৯৮. অধর মানুষ ধরতে যদি চাও
অধর মানুষ ধরতে যদি চাও।
নিরাকার সেই রূপটি নেহারি, গুরুর চরণে দাও॥
শুন্যে ভাসে সেই যে রূপ, দেখো মন দিয়ে নিশ্চুপ॥
৯৯. লালন বলে আমি কেবল ঘুরি
লালন বলে আমি কেবল ঘুরি, নিজের ছায়া দেখে।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে রইলাম একলা একে॥
একা আসি একা যাই, সাথে কোনো দোসর নাই॥
১০০. দিন থাকতে কেন দিন কাটালি
দিন থাকতে কেন দিন কাটালি, মিছে মায়ায় মজে।
এখন আঁধার যখন নামল ঘরে, কী করবি রে খুঁজে॥
সিরাজ সাঁই কয় লালন রে তোর, দিন গেল সব মিছে,
শেষ সম্বল দয়াল গুরুর নাম ছাড়া আর কী আছে॥
১০১. জাত গেল জাত গেল বলে
জাত গেল জাত গেল বলে এ কি আজব কারখানা।
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সবি দেখি তানা-নানা॥
আসবার কালে কি জাত ছিলে, এসে তুমি কি জাত নিলে,
কি জাত হবে যাবার কালে, সেই কথাটি কেউ বলো না॥
ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চর্মকার মুচি, একই জলেতে সবি শুচি,
লালন বলে জাতের বিচি, ডুবিয়েছি মুড়ির দানা॥
১০২. ধরো চোর হাওয়ার ঘরে (বিস্তার)
ধরো চোর হাওয়ার ঘরে দিয়ে আলেক বাজি।
খেলছে সে যে নূরের শহরে হয়ে সে যে রাজি॥
উপর তলায় সদর কোঠা, আয়না মহল আছে জোঠা,
সেই মহলে খবর পেলে তবেই হবি খাঁটি কাজী॥
১০৩. দেখ না মন ঝকমারি এই দুনিয়া
দেখ না মন ঝকমারি এই দুনিয়া।
ছেড়ে যাবে সবি তোমার মিছে মায়ায় পড়িয়া॥
ঘরবাড়ি আর তল্পিতল্পা, কিছুই যাবে না রে সপা,
একলা পথে একা চলা, ধরো গুরুর চরণ দিয়া॥
১০৪. সিরাজ সাঁই বলে শোন রে লালন
সিরাজ সাঁই বলে শোন রে লালন ভেদের কথা।
আপনারে না চিনলে মনে ঘুচবে না রে ব্যথা॥
মক্কা মদিনা কি খুঁজে বেড়াস, তোরই মাঝে তার প্রকাশ,
আয়না দিয়ে মুখটি দেখ না, পাবি রে তার সত্যতা॥
১০৫. তিন পাগলে মেলা হল (ভাবান্তর)
(নদীয়া থেকে আসা তিন পাগলের সেই ভাবাবেশ, যা সমগ্র গৌড় দেশকে মাতাল করেছিল।)
১০৬. মন রে তুই মরলি না কেন
মন রে তুই মরলি না কেন বেঁচে থাকতে।
মউত আসা বড়ই কঠিন, যমের ঘরে ঢুকতে॥
আমিত্ব তোর মরলে পরে, তবেই যাবি নূরের ঘরে,
লালন বলে সময় থাকতে শেখো রে তুই মরতে॥
১০৭. অধর মানুষ ধরবি যদি (রস তত্ত্ব)
অধর মানুষ ধরবি যদি উজান পথে নাও।
কাম সাগরে তুফান ভারী, সাবধানেতে যাও॥
রতি রক্ষা করলে পরে, তবেই পাবি সেই চরেরে,
লালন কয় ওরে পাগল মন, গুরুর হুকুম মানো॥
১০৮. ওরে মন করলি কি
ওরে মন করলি কি ভবের হাটে এসে।
বেচাকেনা না করিয়া ফিরলি অবশেষে॥
মূলধন যা নিয়েছিলি, সব তো মিছেই খোয়ালি,
এখন কি নিয়ে ফিরবি বল রে স্বদেশে॥
১০৯. কেন মন তুই করলি না রে ভজন
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা।
দিন থাকতে দিন কাটালি মিছে মায়ায় মজে॥
এখন যম আসিলে কী করবি রে, কাঁদবি কেবল মিছে,
লালন কয় ওরে পাগল মন, ধরো গুরুর শ্রী-চরণ॥
incentive ১১০. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
বুঝতে নারি মায়ার ঘোরে পড়ে সারাবেলা॥
কখনো রাজরাজেশ্বর, কখনো সে হয় পথের ফকির,
কখনো যে ডুবে থাকে নূরের দরিয়া॥
১১১. কে বোঝে এই নূরের খেলা
কে বোঝে এই নূরের খেলা অন্ধকারের মাঝে।
রূপের ছটা জগৎ ভাসে, দেখ না মন নিজে॥
আঁখি মুদে দেখ রে পাগল, তোর কলবেই সেই তো সজল,
যারে খুঁজিস আসমানে সে তো আছে তোরই সাজে॥
১১২. তৌহিদ চেনা সহজ নয়
তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে এ ভবের বাজারে।
একের মাঝে অনেক আছে, অনেকের মাঝে এক যে রয়॥
মূলে এক জল ভিন্ন নয়, পাত্রভেদে ভিন্ন কয়,
লালন কয় সেই একের ভেদ জানলে পরে মুক্তি হয়॥
১১৩. আদম সফিউল্লাহ বলে ডাকছে সবাই
আদম সফিউল্লাহ বলে ডাকছে সবাই জগত জুড়ে।
আদমের ভেতরে কে ছিল রে, দেখ না মন খুঁজে॥
মাটির পুতুল নড়ে চড়ে, নূরের কণা আছে তাতে,
লালন কয় সেই নূরের সন্ধানেই মুক্তি পাই॥
১১৪. ও যার আপন খবর আপনার হয় না
ও যার আপন খবর আপনার হয় না।
আপনারে চিনলে পরে অচিন চেনা যায়॥
আপন ঘরের খবর লও না, পরের খবর করতে যাও না,
লালন কয় আমি কেবল ঘুরি মিছে এই দুনিয়া॥
১১৫. আর কত কাল ঘুরবি রে মন
আর কত কাল ঘুরবি রে মন ভবের এই হাটে।
জীবন তরী বাইতে বাইতে বেলা গেল ঘাটে॥
এখন গুরুর নাম স্মঙরি, তরাবে তোরে সেই কাণ্ডারি॥
১১৬. প্রেমের মরা কি আর মরে (ভাবান্তর)
প্রেমের মরা কি আর মরে মউত আসলে পরে।
জ্যান্ত মরা হয়ে যে রয়, কি ভয় তাহার যমেরে॥
প্রেমের আগুনে পুড়লে পরে, খাঁটি সোনা হয় রে হীরে,
লালন কয় সেই রূপের মানুষ বসত করে অন্তরে॥
১১৭. এলাহি আলমিন গো আল্লাহ (আকুতি)
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ তুমি পার করো আমারে।
আমি গোনাহগার এক পাপিষ্ঠ বান্দা ডাকি হে তোমারে॥
নিজের দোষে হলাম দোষী, গলে দিলাম মায়ার ফাঁসি॥
১১৮. গুরু চিনে রাখো রে মন
গুরু চিনে রাখো রে মন ভবের কুহকে পড়ো না।
গুরু বিনে আর কেহ নেই আঁধার ঘরে আলোক দানা॥
১১৯. অধর মানুষ ধরতে যদি চাও
অধর মানুষ ধরতে যদি চাও নিরাকার সেই রূপটি দেখো।
শুন্যে ভাসে সেই যে রূপ, দেখো মন দিয়ে নিশ্চুপ॥
১২০. দিন থাকতে কেন দিন কাটালি
দিন থাকতে কেন দিন কাটালি মিছে মায়ায় মজে।
এখন আঁধার যখন নামল ঘরে কী করবি রে খুঁজে॥
১২১. নবি না চিনলে কি আল্লা পাওয়া যায়
নবি না চিনলে কি আল্লা পাওয়া যায়।
নবি আর আল্লা কি ভিন্ন বলায়॥
যেমন কুদরতি নূর আল্লারই প্রকাশ,
নবিও তেমনি সেই নূরেরই বিকাশ।
লালন বলে নবির কদম ধরলে পরে,
তবেই তো মাবুদের দেখা মিলবে রে॥
১২২. কে কথা কয় রে দেখা দেয় না
কে কথা কয় রে দেখা দেয় না।
নড়ে চড়ে হাতের কাছে খুঁজলে মেলে না॥
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি যেমন আসে যায়,
তেমনি এক গোলকধাঁধায় এই দেহটা রয়।
লালন কয় আমি কেবল হাতড়ে মরি আঁধারে॥
১২৩. দিন থাকতে দিন কেন কাটালি
দিন থাকতে দিন কেন কাটালি মিছে মায়ায়।
বেলা শেষে আঁধার হলে কী করবি উপায়॥
পশুপাখি নিজ নীড়ে ফেরে সন্ধ্যা হলে পরে,
তোর তো ঠিকানা নেই এই ভবের ঘরে॥
১২৪. দয়াল গুরুর দয়া হলে
দয়াল গুরুর দয়া হলে তবেই চেনা যায়।
অধর মানুষ অধর দিয়ে ধরতে হয় গো তায়॥
গুরুই হলো নূরের বাতি আঁধার ঘরের আলো,
তারে চিনলে তবেই তো জগত হবে ভালো॥
১২৫. অধর মানুষ ধরবি যদি উজান চলো
অধর মানুষ ধরবি যদি উজান চলো ওরে মন।
কাম সাগরের ঢেউ এড়িয়ে ধরো সেই রতন॥
রতি রক্ষা করলে পরে কাম হবে রে প্রেম,
লালন কয় তবেই পাবি খাঁটি সোনার ফ্রেম॥
১২৬. মানুষের ভিতর মানুষ বসত করে
মানুষের ভিতর মানুষ বসত করে সবি।
মানুষের রূপটি নেহার দেখবি রে ছবি॥
ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে ভাই মানুষেরি দেহে পাই,
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায় রে ভাই॥
১২৭. তিন পাগলে মেলা হল নদে এসে
তিন পাগলে মেলা হল নদে এসে।
একটা পাগল কামিজ পরে পাগল সাজিয়েছে॥
আরেক পাগল প্রেমের দায়ে ঘর ছেড়েছে আজ,
লালন কয় পাগল চিনিতে পারলাম না রে দুনিয়ার মাঝ॥
১২৮. মন তুই রইলি খাঁচার আশে
মন তুই রইলি খাঁচার আশে।
খাঁচা যে তোর তৈরি কাঁচা বাঁশে॥
কোন্ দিন খাঁচা পড়বে খসে পাখি দেবে উড়ান,
লালন কয় তবেই বুঝবি দুনিয়ারই নিশান॥
১২৯. সিরাজ সাঁই বলে শোন রে লালন
সিরাজ সাঁই বলে শোন রে লালন খবর।
মউত তো একিনের কথা জানো নিরন্তর॥
জ্যান্ত মরা হয়ে যে রয় তার কিসের ভয়,
আপন চিনে পরকে চিনলে তবেই মুক্তি হয়॥
১৩০. আল্লাহ্ নাম জপলে কি হয়
আল্লাহ্ নাম জপলে কি হয় যদি না চিনলি রূপ।
পুতুল নিয়ে খেললি সারা জীবন হয়ে চুপ॥
হৃদয় মাঝে স্রষ্টা বিরাজ করে সারাক্ষণ,
তারে না দেখে মক্কা যাস কোন কাজে রে মন॥
১৩১. প্রেমের ফাঁদে পড়লে পরে
প্রেমের ফাঁদে পড়লে পরে তবেই বোঝা যায়।
মিষ্ট লাগে বিষের জ্বালা প্রেমেরই দয়ায়॥
প্রেমিক বিনে প্রেমের মর্ম কেউ কি বোঝে আর,
লালন কয় প্রেম বিনে জগত অন্ধকার॥
১৩২. আরশিনগর বাড়ির পাশে
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর...
(পূর্ববর্তী খণ্ডের মূল ভাব বজায় রেখে এর মারেফতি ব্যাখ্যা এখানে তাত্ত্বিকভাবে বিস্তৃত।)
১৩৩. কলব কাঁচায় জিকির করো
কলব কাঁচায় জিকির করো ওরে আমার মন।
জিকির বিনে জং ধরবে যে তোর রতন॥
নিশ্বাস প্রশ্বাসে যার জিকির জারি রয়,
লালন কয় তবেই সে তো পরমাত্মাকে পায়॥
১৩৪. আদম তৈরি হলে পরে
আদম তৈরি হলে পরে কুদরত খেলা করে।
ফেরেশতারা সিজদা দিল নূরের খাতিরে॥
ইবলিস কেন দূরে রইল জাতের গর্ব করি,
লালন বলে অহংকারী যায় রে জাহান্নাম পুরী॥
১৩৫. শরিয়ত আর মারেফত
শরিয়ত আর মারেফত দুই ধারা এক জায়গায়।
যেমন গাছের ছাল আর শাঁস রয় এক কায়ায়॥
ছাল ছাড়া ফল বাঁচে না ভাই কথাটি তো সত্য,
মারেফত বিনে শরিয়ত হলো কেবল রিক্ত॥
১৩৬. রসিক না হলে কি চেনা যায়
রসিক না হলে কি চেনা যায় সেই রসের মানুষ।
মানুষ ভজলে তবেই হবি হাকিকতের ফানুস॥
রসের মানুষ রসে থাকে রসের ধারা বয়,
লালন বলে প্রেম বিনে সে তো ধরা নাহি দেয়॥
১৩৭. তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে
তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে এ ভবের বাজারে।
একের মাঝে অনেক আছে অনেকের মাঝে এক যে রয়॥
মূলে এক জল ভিন্ন নয় পাত্রভেদে ভিন্ন হয়॥
১৩৮. যার আপন খবর আপনার হয় না
যার আপন খবর আপনার হয় না।
আপনারে চিনলে পরে তবেই অচিন চেনা যায়॥
বাইরে খুঁজে বেড়াস যারে সে তো আছে তোরই দ্বারে॥
১৩৯. দিন গেল আমার মিছে কাজে
দিন গেল আমার মিছে কাজে বেলা হয়ে এল শেষ।
কী নিয়ে ফিরব দেশে রইল যে অবশেষ॥
গুরুর কৃপা না পাইলে কী হবে উপায়,
লালন কয় একা আমি অকূল দরিয়ায়॥
১৪০. মনের মানুষ মনের কোণে
যারে খুঁজি এ ভুবনে সে যে বাস করে এই মনের কোণে।
প্রেম রস না হলে মিলবে না সে রত্নে॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছি কালো শশী॥
১৪১. নবীনবী তত্ত্বের কথা
নবীনবী তত্ত্বের কথা কে বোঝে রে ভাই।
আদমের ঐ দেহ-মাঝে নয়টি রতন পাই॥
নয়জন নবি নয়টি ঘরে, দিচ্ছে পাহারা জগত জুড়ে,
লালন কয় সে রূপ যে চিনেছে, শমন-ভয় তার নাই॥
১৪২. আমার ঘরের চাবি পরের হাতে
আমার ঘরের চাবি পরের হাতে।
কেমনে খুলিব সে ঘর দেখিব না নয়ন পথে॥
আপন ঘরে বোঝাই সোনা, পর হয়ে কর লেনাদেনা,
লালন কয় আমি ঘরের খবর জানলাম না এই জন্মেতে॥
১৪৩. ওরে মন তুই করলি কি
ওরে মন তুই করলি কি ভবের হাটে এসে।
বেচাকেনা না করিয়া ফিরলি অবশেষে॥
গুরুর বাক্য না মানিলে, পরকাল তোর যাবে বিফলে,
লালন বলে সময় থাকতে ধরো গুরুর দেশে॥
১৪৪. যার আপন চেনা হয় না
যার আপন চেনা হয় না, তার পর চেনা কি আর হয়।
আপনারে চিনলে পরে তবেই অচিন চেনা যায়॥
বাইরে খুঁজি মক্কা-কাশি, অন্তরে মোর চন্দ্র-শশী,
লালন বলে নিজের কলবে দেখ না রে কার জ্যোতি রয়॥
১৪৫. এই মানুষে আছে রে সেই মানুষ
এই মানুষে আছে রে সেই মানুষ।
যারে বলে সহজ মানুষ, যারে বলে ফানুস॥
মানুষের ভিতর মানুষ বাস করে, নূরের জ্যোতিতে খেলা করে,
তারে ধরবি যদি ওরে মন, তবে ধরো গুরুর শ্রী-চরণ॥
১৪৬. সময় গেলে সাধন হবে না
সময় গেলে সাধন হবে না।
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা॥
কাঁচা বাঁশে ঘুণে ধরলে, সে কি আর বাঁশি হয় রে,
তেমনি দেহ থাকতে সাধন না করলে পস্তাতে হয় রে॥
১৪৭. মন তুই দেখলি না রে মন
মন তুই দেখলি না রে মন।
কেমন করে ঘর বেঁধেছে সাঁই নিরিঞ্জন॥
রক্ত মাংসের ঘরখানি, মাঝখানে এক সোনার খনি,
সে খনিতে বাস করে মোর প্রাণের প্রাণধন॥
১৪৮. যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে
যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে।
তাঁর কিসের ভয় আছে এই ভুবনে॥
গুরুর কৃপা যার শিরে রয়, শমন ডরে সে কি আর রয়,
ভব-কারাগার ত্বরিতে সে পার হতে পারে॥
১৪৯. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
বুঝতে নারি মায়ার ঘোরে পড়ে সারাবেলা॥
কখনো রাজরাজেশ্বর, কখনো সে হয় পথের ফকির,
কখনো যে ডুবে থাকে নূরের দরিয়া॥
১৫০. পাড় করো দয়াল আমারে
পাড় করো দয়াল আমারে।
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারাবারে॥
না জানি সাঁতার আমি, না জানি পাড়ি,
কেমনে তরাবে আমায় এই ভব-বারি॥
১৫১. আল্লাহ্ আদম সৃষ্টি করে
আল্লাহ্ আদম সৃষ্টি করে, নিজে রইলেন কুদরতে।
আদমের সুরতে আল্লাহ্ খেলছেন খেলা এ জগতে॥
ফেরেশতারা সিজদা দিল, ইবলিস কেন দূরে রইল,
আদমের ভেতরের নূর চিনতে পারল না সে॥
১৫২. জাত গেল জাত গেল বলে
জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা।
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সবি দেখি তানা-নানা॥
আসবার কালে কি জাত ছিলে, এসে তুমি কি জাত নিলে,
কি জাত হবে যাবার কালে, সেই কথাটি কেউ বলো না॥
১৫৩. ধরো মানুষ ভজ মানুষ
ধরো মানুষ ভজ মানুষ, মানুষেই সব রয়।
মানুষ ছাড়া এই ত্রিভুবনে আর কিছু তো নয়॥
মানুষের ভেতরে মানুষ, করছে যে ফানুস,
সেই মানুষকে চিনলে তবেই মুক্তি মেলে ভাই॥
১৫৪. দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে ভাই।
শরিয়ত আর মারেফত, কোনটা যে আমার পথ॥
মোল্লা বলে এইটি সত্য, আউলিয়া বলে ঐটি তথ্য,
লালন কয় আমি কেবল অন্ধ হয়ে রই॥
১৫৫. গুরুপদে নিষ্ঠা যার
গুরুপদে নিষ্ঠা যার, সেই কি সামান্য কি আর।
ভবে সেই তো কামিল জহুরি চিনবে সে রতন সার॥
গুরুর চরণে মন মজিলে, মণি-মুক্তো আপনি মিলে,
লালন কয় আমি অভাগা পলাম গোলক ধাঁধায়॥
১৫৬. নবীরে চিনেছ যে জন
নবীরে চিনেছ যে জন, খোদারে চিনেছে সে জন।
নবীর নূর তো আল্লাহরই নূর, নেই কোনো প্রভেদ জান॥
সিরাজ সাঁই কয় শোনো লালন, নবীর চরণে করো যতন॥
১৫৭. মউত তো একিনের খবর
মউত তো একিনের খবর, মন রে তুই জানলি না।
মরার আগে মরে যে জন, তার কিসের শমন-ভয়॥
আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে, প্রেমের দরিয়ায় ডুব দিয়ে,
হয়ে যা তুই ফানা-ফিল্লা আল্লাহরই নূরে॥
১৫৮. যে জন রূপ নেহারে
যে জন রূপ নেহারে, সে কি আর ভুলে যায় তারে।
রূপের ছটায় জগৎ ভাসে, ও সে নূরের শহরে॥
সেই রূপ যে জন দেখেছে, দুনিয়ার মায়া সে ত্যজেছে,
লালন কয় সেই নূরের পুতুল বসত করে অন্তরে॥
১৫৯. নিগূঢ় খবর জানলে পরে
নিগূঢ় খবর জানলে পরে, তবেই তো ধরা যায়।
সে যে নূরের পুতুল নূরের খেলা, নূরের জ্যোতিতে মিশে রয়॥
১৬০. দিন থাকতে কেন দিন কাটালি
দিন থাকতে কেন দিন কাটালি মিছে মায়ায় মজে।
এখন আঁধার যখন নামল ঘরে কী করবি রে খুঁজে॥
সিরাজ সাঁই কয় লালন রে তোর দিন গেল সব মিছে,
শেষ সম্বল দয়াল গুরুর নাম ছাড়া আর কী আছে॥
১৬১. নবী না চিনলে কি আল্লা পাওয়া যায়
নবী না চিনলে কি আল্লা পাওয়া যায়।
নবী আর আল্লা কি ভিন্ন বলায়॥
যেমন কুদরতি নূর আল্লারই প্রকাশ,
তেমনি নবুয়ত নূরেরই বিকাশ।
লালন বলে নবীর কদম ধরলে পরে,
তবেই তো মাবুদের দেখা মিলবে রে॥
১৬২. ধরো চোর হাওয়ার ঘরে (বিস্তার)
ধরো চোর হাওয়ার ঘরে দিয়ে আলেক বাজি।
খেলছে সে যে নূরের শহরে হয়ে সে যে রাজি॥
উপর তলায় সদর কোঠা, আয়না মহল আছে জোঠা,
সেই মহলে খবর পেলে তবেই হবি খাঁটি কাজী॥
১৬৩. কলব-কাঁচায় জিকির করো
কলব-কাঁচায় জিকির করো ওরে আমার মন।
জিকির বিনে জং ধরবে যে তোর অমূল্য রতন॥
নিশ্বাস প্রশ্বাসে যার জিকির জারি রয়,
লালন কয় তবেই সে তো পরমাত্মাকে পায়॥
১৬৪. আদম তৈরি হলে পরে
আদম তৈরি হলে পরে কুদরত খেলা করে।
ফেরেশতারা সিজদা দিল নূরের খাতিরে॥
ইবলিস কেন দূরে রইল জাতের গর্ব করি,
লালন বলে অহংকারী যায় রে জাহান্নাম পুরী॥
১৬৫. শরিয়ত আর মারেফত
শরিয়ত আর মারেফত দুই ধারা এক জায়গায়।
যেমন গাছের ছাল আর শাঁস রয় এক কায়ায়॥
ছাল ছাড়া ফল বাঁচে না ভাই কথাটি তো সত্য,
মারেফত বিনে শরিয়ত হলো কেবল রিক্ত॥
১৬৬. রসিক না হলে কি চেনা যায়
রসিক না হলে কি চেনা যায় সেই রসের মানুষ।
মানুষ ভজলে তবেই হবি হাকিকতের ফানুস॥
রসের মানুষ রসে থাকে রসের ধারা বয়,
লালন বলে প্রেম বিনে সে তো ধরা নাহি দেয়॥
১৬৭. তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে
তৌহিদ চেনা সহজ নয় রে এ ভবের বাজারে।
একের মাঝে অনেক আছে অনেকের মাঝে এক যে রয়॥
মূলে এক জল ভিন্ন নয় পাত্রভেদে ভিন্ন হয়॥
১৬৮. যার আপন খবর আপনার হয় না
যার আপন খবর আপনার হয় না।
আপনারে চিনলে পরে তবেই অচিন চেনা যায়॥
বাইরে খুঁজে বেড়াস যারে সে তো আছে তোরই দ্বারে॥
১৬৯. দিন গেল আমার মিছে কাজে
দিন গেল আমার মিছে কাজে বেলা হয়ে এল শেষ।
কী নিয়ে ফিরব দেশে রইল যে অবশেষ॥
গুরুর কৃপা না পাইলে কী হবে উপায়,
লালন কয় একা আমি অকূল দরিয়ায়॥
১৭০. মনের মানুষ মনের কোণে
যারে খুঁজি এ ভুবনে সে যে বাস করে এই মনের কোণে।
প্রেম রস না হলে মিলবে না সে রত্নে॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছি কালো শশী॥
১৭১. মউত তো একিনের খবর
মউত তো একিনের খবর, মন রে তুই জানলি না।
মরার আগে মরে যে জন, তার কিসের শমন-ভয়॥
আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে, প্রেমের দরিয়ায় ডুব দিয়ে,
হয়ে যা তুই ফানা-ফিল্লা আল্লাহরই নূরে॥
১৭২. যে জন রূপ নেহারে
যে জন রূপ নেহারে, সে কি আর ভুলে যায় তারে।
রূপের ছটায় জগৎ ভাসে, ও সে নূরের শহরে॥
সেই রূপ যে জন দেখেছে, দুনিয়ার মায়া সে ত্যজেছে,
লালন কয় সেই নূরের পুতুল বসত করে অন্তরে॥
১৭৩. নিগূঢ় খবর জানলে পরে
নিগূঢ় খবর জানলে পরে, তবেই তো ধরা যায়।
সে যে নূরের পুতুল নূরের খেলা, নূরের জ্যোতিতে মিশে রয়॥
১৭৪. দিন থাকতে কেন দিন কাটালি
দিন থাকতে কেন দিন কাটালি মিছে মায়ায় মজে।
এখন আঁধার যখন নামল ঘরে কী করবি রে খুঁজে॥
সিরাজ সাঁই কয় লালন রে তোর দিন গেল সব মিছে,
শেষ সম্বল দয়াল গুরুর নাম ছাড়া আর কী আছে॥
১৭৫. প্রেমের ফাঁদে পড়লে পরে
প্রেমের ফাঁদে পড়লে পরে তবেই বোঝা যায়।
মিষ্ট লাগে বিষের জ্বালা প্রেমেরই দয়ায়॥
প্রেমিক বিনে প্রেমের মর্ম কেউ কি বোঝে আর,
লালন কয় প্রেম বিনে জগত অন্ধকার॥
১৭৬. আরশিনগর বাড়ির পাশে (বিস্তার)
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর...
(পূর্ববর্তী খণ্ডের মূল ভাব বজায় রেখে এর মারেফতি ব্যাখ্যা এখানে তাত্ত্বিকভাবে বিস্তৃত।)
১৭৭. আল্লাহ্ নাম জপলে কি হয়
আল্লাহ্ নাম জপলে কি হয় যদি না চিনলি রূপ।
পুতুল নিয়ে খেললি সারা জীবন হয়ে চুপ॥
হৃদয় মাঝে স্রষ্টা বিরাজ করে সারাক্ষণ,
তারে না দেখে মক্কা যাস কোন কাজে রে মন॥
১৭৮. মানুষের ভিতর মানুষ বসত করে
মানুষের ভিতর মানুষ বসত করে সবি।
মানুষের রূপটি নেহার দেখবি রে ছবি॥
ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে ভাই মানুষেরি দেহে পাই,
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায় রে ভাই॥
১৭৯. সিরাজ সাঁই বলে শোন রে লালন
সিরাজ সাঁই বলে শোন রে লালন খবর।
মউত তো একিনের কথা জানো নিরন্তর॥
জ্যান্ত মরা হয়ে যে রয় তার কিসের ভয়,
আপন চিনে পরকে চিনলে তবেই মুক্তি হয়॥
১৮০. ধরো চোর হাওয়ার ঘরে (সংক্ষিপ্ত)
ধরো চোর হাওয়ার ঘরে দিয়ে আলেক বাজি।
খেলছে সে যে নূরের শহরে হয়ে সে যে রাজি॥
১৮১. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি॥
ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে রে ভাই, মানুষেরি দেহে তা পাই,
মানুষের ভিতরে মানুষ বসত করে সবি॥
১৮২. ওরে মন তুই করলি কি
ওরে মন তুই করলি কি ভবের হাটে এসে।
বেচাকেনা না করিয়া ফিরলি অবশেষে॥
মূলধন যা নিয়েছিলি, সব তো মিছেই খোয়ালি,
এখন কী নিয়ে ফিরবি বল রে স্বদেশে॥
১৮৩. দিন থাকতে কেন দিন কাটালি
দিন থাকতে কেন দিন কাটালি মিছে মায়ায় মজে।
এখন আঁধার যখন নামল ঘরে কী করবি রে খুঁজে॥
সিরাজ সাঁই কয় লালন রে তোর দিন গেল সব মিছে,
শেষ সম্বল দয়াল গুরুর নাম ছাড়া আর কী আছে॥
১৮৪. কে কথা কয় রে দেখা দেয় না
কে কথা কয় রে দেখা দেয় না।
নড়ে চড়ে হাতের কাছে খুঁজলে মেলে না॥
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি যেমন আসে যায়,
তেমনি এক গোলকধাঁধায় এই দেহটা রয়॥
১৮৫. আদম তৈরি হলে পরে
আদম তৈরি হলে পরে কুদরত খেলা করে।
ফেরেশতারা সিজদা দিল নূরের খাতিরে॥
ইবলিস কেন দূরে রইল জাতের গর্ব করি,
লালন বলে অহংকারী যায় রে জাহান্নাম পুরী॥
১৮৬. জাত গেল জাত গেল বলে
জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা।
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সবি দেখি তানা-নানা॥
আসবার কালে কী জাত ছিলে, এসে তুমি কী জাত নিলে,
কী জাত হবে যাবার কালে, সেই কথাটি কেউ বলো না॥
১৮৭. পাড় করো দয়াল আমারে
পাড় করো দয়াল আমারে।
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারাবারে॥
না জানি সাঁতার আমি, না জানি পাড়ি,
কেমনে তরাবে আমায় এই ভব-বারি॥
১৮৮. সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা
সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
বুঝতে নারি মায়ার ঘোরে পড়ে সারাবেলা॥
কখনো রাজরাজেশ্বর, কখনো সে হয় পথের ফকির,
কখনো যে ডুবে থাকে নূরের দরিয়া॥
১৮৯. তিন পাগলে হল মেলা
তিন পাগলে হল মেলা নদে এসে।
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে॥
একটা পাগলামি করে, জাত দেয় সে অজাতেরে,
লালন কয় ওরে মন, ও পাগল চিনবি রে কখন॥
১৯০. যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে
যে জন সিরাজ সাঁইকে চিনেছে।
তাঁর কিসের ভয় আছে এই ভুবনে॥
গুরুর কৃপা যার শিরে রয়, শমন ডরে সে কি আর রয়,
ভব-কারাগার ত্বরিতে সে পার হতে পারে॥
১৯১. সত্য বল সুপথে চল
সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন।
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবি না রে সেই রতন॥
মানুষে মানুষ গাঁথা, ও সে যেমনি বৃক্ষে লতা,
লালন বলে সিরাজ সাঁইয়ের বুলি, সত্য বিনে মুক্তি নাই রে॥
১৯২. মন রে তুই থাকলি কি সুখে
মন রে তুই থাকলি কি সুখে।
গুরুর বাক্য না রাখিলে পস্তাবি অন্তিমে॥
আসিল সমন যখন, কী করবে তোর ধন-জন,
লালন কয় একা হবি পথের ভিখারি রে॥
১৯৩. পাপ পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই
পাপ পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই।
এ জগতে পাপ পুণ্য বলছে কেন সবাই॥
জলকে যেমন বরফ কয়, আবার সে তো জলই হয়,
তেমনি পাপ ও পুণ্য একই মূলে রয় জানি ভাই॥
১৯৪. লালন কয় আমি কোন পথে যাই
লালন কয় আমি কোন পথে যাই।
দোটানায় পড়ে আমি প্রাণ হারাই রে ভাই॥
শরিয়ত আর মারেফত, কোনটা যে আমার পথ,
গুরুর কৃপা ছাড়া আমি কুল-কিনারা না পাই॥
১৯৫. দেহ ঘরটি যখন খসে পড়বে
দেহ ঘরটি যখন খসে পড়বে।
সেদিন তোমার আপন কে বা হবে॥
ঘরবাড়ি আর টাকা-কড়ি, সব থাকবে পড়ে দুনিয়ায়,
একলা তুমি যাবে শ্মশান বা গোরস্তানে রে॥
১৯৬. ধরো মানুষ ভজ মানুষ
ধরো মানুষ ভজ মানুষ, মানুষেই সব রয়।
মানুষ ছাড়া এই ত্রিভুবনে আর কিছু তো নয়॥
মানুষের ভেতরে মানুষ, করছে যে ফানুস,
সেই মানুষকে চিনলে তবেই মুক্তি মেলে ভাই॥
১৯৭. দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন
দিন থাকতে কেন মন করলি না যতন।
বেলা শেষে আঁধার হলে কী করবি তখন॥
ভবের হাটে কেনা-বেচা, সবই তো তোর মিছে ঘষা,
লালন কয় সিরাজ সাঁইয়ের চরণে করো নিবেদন॥
১৯৮. মিলন হবে কত দিনে
মিলন হবে কত দিনে।
আমার মনের মানুষের সনে॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি, চেয়ে আছি কালো শশী,
যারে খুঁজি এ ভুবনে, সে যে বাস করে এই মনের কোণে॥
১৯৯. সময় গেলে সাধন হবে না
সময় গেলে সাধন হবে না।
কেন মন তুই করলি না রে ভজন আর উপাসনা॥
কাঁচা বাঁশে ঘুণে ধরলে, সে কি আর বাঁশি হয় রে,
তেমনি দেহ থাকতে সাধন না করলে পস্তাতে হয় রে॥
২০০. প্রেমের মরা কি আর মরে
প্রেমের মরা কি আর মরে।
মরে না রে সে তো জ্যান্ত হয়ে প্রেমের অনলে তরে॥
যে মরেছে প্রেমের দায়, তার কি মউতের ভয় রয়,
লালন কয় সে অমর হয়ে বিরাজ করে অন্তরে॥
ভোলাই শাহের পাণ্ডুলিপি
ভোলাই শাহের পাণ্ডুলিপি
সৃষ্টিতত্ত্ব ও নূরের রহস্য
শুরুতে আল্লাহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তিনি একাকী ছিলেন এবং নিজের মহিমা প্রকাশের জন্য সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করলেন। এই ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে তিনি নিজের নূর থেকে ‘নূরে মুহাম্মাদী’ সৃষ্টি করলেন। এই নূরই মহাবিশ্বের সমস্ত সৃষ্টির মূল ভিত্তি। আল্লাহ যখন সেই নূরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, তখন তা থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরল, যা থেকে আসমান, জমিন, আরশ, কুরসি এবং সমস্ত জগত সৃষ্টি হলো।
মানবেতিহাস ও আদম সৃষ্টির ইতিবৃত্ত
আল্লাহ মাটি দিয়ে আদম (আ.)-এর দেহ তৈরি করলেন এবং তাতে নিজের রূহ ফুঁকে দিলেন। আদমকে সমস্ত বিষয়ের জ্ঞান দান করা হলো, যা ফেরেশতারাও জানত না। আদমের এই শ্রেষ্ঠত্ব দেখে ইবলিস ব্যতীত সকল ফেরেশতা সিজদা করল। ইবলিস তার অহংকারের কারণে অভিশপ্ত হলো। এরপর হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টি এবং গন্ধম ফল ভক্ষণের মাধ্যমে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে তাঁদের আগমন ঘটে। পৃথিবীতেই শুরু হয় মানব বংশের বিস্তার এবং নবুওয়াতের ধারা।
মুর্শিদ ও মারেফতের গুরুত্ব
আত্মিক মুক্তির জন্য একজন কামেল মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মুর্শিদ হলেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি শিষ্যকে অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে নিয়ে যান। শরীয়তের নিয়ম পালনের পাশাপাশি মারেফতের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কেবল কিতাব পড়ে বা বাহ্যিক ইবাদতে স্রষ্টাকে পাওয়া সম্ভব নয়; বরং অন্তরের আয়না পরিষ্কার করে তাতে স্রষ্টার নূর দর্শন করতে হয়। মুর্শিদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও প্রেমই হলো আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি।
দেহ-তত্ত্ব ও আত্মদর্শন
এই দেহ হলো এক ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড। দেহের মধ্যেই সাত আসমান, সাত জমিন এবং আঠারো মোকাম বিদ্যমান। দেহের নাভিমূল, কলব ও মগজের মধ্যে লুকিয়ে আছে গূঢ় রহস্য। যে ব্যক্তি নিজের দেহকে চিনতে পেরেছে, সে তার রবকে চিনতে পেরেছে। পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে নফসকে দমন করাই হলো প্রকৃত জিহাদ। মানুষের হৃদয়েই আল্লাহর বাস, তাই বাইরে তাকে খুঁজে বেড়ানো বৃথা।
সাধন তত্ত্ব ও চার মুকাম
মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রায় চারটি প্রধান স্তর বা মুকাম অতিক্রম করতে হয়: শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফত। শরীয়ত হলো দেহের জন্য নির্ধারিত নিয়ম-কানুন, যা নৌকার খোলের মতো। তরিকত হলো সেই পথ যা দিয়ে গভীর সমুদ্রে যাত্রা করতে হয়। হাকিকত হলো সত্যের উপলব্ধি, আর মারেফত হলো স্রষ্টার সাথে পরম মিলন। এই চার স্তর একে অপরের পরিপূরক; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অর্জন করা সম্ভব নয়। সাধককে প্রতিটি ধাপে ধৈর্য ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হয়।
প্রেম ও বিরহের অনল
স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির মিলন কেবল তর্কের মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং তা সম্ভব অগাধ প্রেমের মাধ্যমে। এই প্রেম হলো আগুনের মতো যা মনের ভেতরের সমস্ত কলুষতা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। মজনু যেমন লায়লার প্রেমে পাগল হয়েছিলেন, তেমনি সাধককেও তার মাশুকের (স্রষ্টার) প্রেমে বিভোর হতে হয়। বিরহের যন্ত্রণায় যখন হৃদয় দগ্ধ হয়, তখনই সেখানে নূরের প্রকাশ ঘটে। দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রেমের এই পথে পা বাড়ানোই হলো প্রকৃত ফকিরি।
মুরব্বি ও সুহবতের প্রভাব
সৎসঙ্গ বা সুহবত ছাড়া অন্তরের ময়লা দূর হয় না। কামেল পীর বা মুর্শিদের সান্নিধ্য লোহাকে সোনায় রূপান্তর করার মতো। মুর্শিদের হুকুম পালন করা এবং তাঁর খেদমত করাই হলো মুরিদের প্রধান কর্তব্য। গুরু-শিষ্যের এই সম্পর্ক কেবল ইহজাগতিক নয়, বরং তা পরকালেও মুক্তির উসিলা হবে। যার কোনো মুর্শিদ নেই, তার মুর্শিদ শয়তান—এই তত্ত্ব বিশ্বাস করে সাধককে একনিষ্ঠভাবে একজন গুরুর চরণে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
কলব ও জিকিরের হাকিকত
মানুষের বুকের বাম পাশে যে মাংসপিণ্ড আছে, তা-ই হলো কলব বা হৃদয়। তবে এই কলবের গভীরে রয়েছে আধ্যাত্মিক চক্ষু। জিকিরের মাধ্যমে এই কলবকে সজাগ করতে হয়। কেবল মুখে 'আল্লাহ' বললেই জিকির হয় না, বরং শ্বাসে-প্রশ্বাসে স্রষ্টাকে স্মরণ করাই হলো 'পাস-আনফাস' জিকির। যখন কলব জিকিরে জারি হয়ে যায়, তখন সাধক ঘুমের ঘোরেও স্রষ্টার সান্নিধ্য অনুভব করেন। এই অবস্থায় পৌঁছালে দুনিয়ার কোনো কিছুই আর সাধককে বিচলিত করতে পারে না।
নফস ও কুপ্রবৃত্তির দমন
মানুষের ভেতর দুটি সত্তা লড়াই করে: একটি রহমানি (ঐশ্বরিক) এবং অন্যটি শয়তানি। এই শয়তানি সত্তাই হলো 'নফস' বা কুপ্রবৃত্তি। নফস মানুষকে দুনিয়ার লালসা, হিংসা এবং অহংকারের দিকে ধাবিত করে। সাধকের প্রথম কাজ হলো এই নফসকে চেনা এবং তাকে বশীভূত করা। নফসকে মারতে পারলে তবেই কলবে মারেফতের আলো প্রবেশ করে। উপবাস, জিকির এবং অল্প কথা বলার মাধ্যমে নফসকে দুর্বল করে আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হয়।
ইশকের মাকাম ও ফানা-ফিল্লা
ইশক বা প্রেম হলো এমন এক সমুদ্র যার কোনো কূল নেই। যখন কোনো বান্দা আল্লাহর প্রেমে মগ্ন হয়, তখন সে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় 'ফানা'। অর্থাৎ নিজের আমিত্বকে আল্লাহর ইচ্ছায় বিলীন করে দেওয়া। এই স্তরে পৌঁছালে সাধক আর আলাদা কিছু দেখেন না; তিনি জগতের প্রতিটি ধূলিকণায় স্রষ্টার কারিশমা প্রত্যক্ষ করেন। প্রেমের এই আগুনে পুড়ে যে খাঁটি হয়, সেই কেবল 'বাকাবিল্লাহ' বা স্রষ্টার সাথে চিরস্থায়ী মিলনের স্বাদ পায়।
শরীয়ত ও মারেফতের সমন্বয়
শরীয়ত হলো গাছের ছালের মতো আর মারেফত হলো তার শাঁস বা ফল। ছাল ছাড়া যেমন ফল বাঁচে না, তেমনি শরীয়ত ছাড়া মারেফতের দাবি করা ভণ্ডামি। নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত হলো ইমারতের ভিত্তি। কিন্তু কেবল ভিত্তি দিয়ে যেমন ঘর হয় না, তেমনি অন্তরের বিশ্বাস ও মারেফতের নূর ছাড়া ইবাদত অপূর্ণ। জাহেরি (বাহ্যিক) এবং বাতেনি (অভ্যন্তরীণ) উভয় দিক বজায় রাখাই হলো কামেল পীরদের পথ।
মৃত্যু ও মহাপ্রয়াণ
মৃত্যু মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং এক জগত থেকে অন্য জগতে স্থানান্তর হওয়া। প্রকৃত মুমিন বা সাধকের কাছে মৃত্যু হলো বন্ধুর সাথে মিলনের আনন্দ। দুনিয়া হলো মুসাফিরখানা, যেখানে মানুষ আসে অল্প সময়ের জন্য। তাই মৃত্যুর আগে মৃত্যুবরণ করা (অর্থাৎ নিজের অহংকার ও নফসকে মেরে ফেলা) অত্যন্ত জরুরি। যে জীবদ্দশায় স্রষ্টাকে চিনতে পেরেছে, মরণের পরে কবরের অন্ধকার তার জন্য বেহেশতের বাগানে পরিণত হয়।
সৃষ্টির মূল ও কুদরতের লীলা
সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু আল্লাহর কুদরতের সাক্ষী। তিনি যখন 'কুন' (হও) শব্দ উচ্চারণ করলেন, তখন মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড দৃশ্যমান হলো। এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এক সুনিপুণ কারিগরের মহিমা। আকাশ, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য—সবই তাঁর হুকুমের গোলাম। মানুষ যখন প্রকৃতির এই শৃঙ্খলার দিকে তাকায়, তখন সে নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করতে পারে। এই বিস্ময়বোধই হলো স্রষ্টাকে জানার প্রথম ধাপ।
আদম ও ইবলিসের দ্বন্দ্বের গূঢ় অর্থ
আদমকে সিজদা না করে ইবলিস যে ভুল করেছিল, তা কেবল অবাধ্যতা ছিল না; তা ছিল প্রেমের অভাব ও অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। ইবলিস কেবল মাটির তৈরি দেহ দেখেছিল, কিন্তু সেই দেহের ভেতর প্রজ্জ্বলিত আল্লাহর নূর দেখতে পায়নি। অন্যদিকে, মানুষ যদি আজ কেবল নিজের রক্ত-মাংসের দেহের যত্ন করে এবং ভেতরের রুহকে ভুলে যায়, তবে সেও ইবলিসের পথেই হাঁটছে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার অবয়বে নয়, বরং তার অন্তরে থাকা ঐশ্বরিক আমানতে।
রিজিক ও তাওয়াক্কুলের হাকিকত
রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষ কেবল উসিলা মাত্র। পাখির মতো সকালবেলা খালি পেটে বের হওয়া এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা হলো প্রকৃত 'তাওয়াক্কুল'। দুনিয়ার মোহে পড়ে হালাল-হারামের পার্থক্য ভুলে যাওয়া ঈমানের দুর্বলতা প্রকাশ করে। অল্পে তুষ্টি বা 'কানায়াত' হলো মুমিনের ভূষণ। যে ব্যক্তি তার ভাগ্যে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
খাঁটি ইবাদত ও মনের একাগ্রতা
কেবল কপালে সিজদার চিহ্ন থাকলেই কেউ ইবাদতগুজার হয় না। সিজদা হতে হবে অন্তরের। নামাজে দাঁড়িয়ে যদি মন দুনিয়ার বাজারে ঘোরে, তবে সেই নামাজ কেবল একটি ব্যায়াম মাত্র। নামাজের আসল প্রাণ হলো 'হুজুরে কালব' বা মনের উপস্থিতি। যখন বান্দা মনে করে সে আল্লাহকে দেখছে, অথবা আল্লাহ তাকে দেখছেন—তখনই ইবাদত সার্থক হয়। বাহ্যিক আচারের চেয়ে ভেতরের একাগ্রতাই আল্লাহর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।
সমাপনী শিক্ষা ও ফকিনি পথের সারকথা
ফকিরি বা আধ্যাত্মিক পথ কোনো পোশাক বা বাহ্যিক আড়ম্বরের নাম নয়; এটি হলো হৃদয়ের এক বিশেষ অবস্থা। ছাই মাখা বা আলখাল্লা পরায় কোনো বাহাদুরি নেই যদি না অন্তর থেকে দুনিয়ার লোভ-লালসা দূর হয়। প্রকৃত ফকির তিনি, যার কাছে সোনা এবং মাটি সমান। মানুষের সেবা এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনই হলো স্রষ্টার নৈকট্য লাভের সহজতম উপায়। যে হৃদয়ে দয়া নেই, সেখানে স্রষ্টার নূর কদাচ প্রবেশ করে না।
আখেরি নসিহত ও বিদায় বাণী
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সাধক কেবল একটি কথাই স্মরণ করিয়ে দেন: সময় থাকতে নিজের ঘর গুছিয়ে নাও। এই নিশ্বাস প্রশ্বাসের কোনো ভরসা নেই; কখন মালাকুল মউত হাজির হবে কেউ জানে না। পরনিন্দা, গিবত এবং অন্যের মনে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাই হলো বড় ইবাদত। সর্বদা 'জিকিরে কলব' জারি রাখা এবং নিজের ত্রুটিগুলো অন্বেষণ করা একজন সাচ্চা মুরিদের লক্ষণ। দুনিয়াকে মুসাফিরখানা মনে করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পরম সত্যের উপলব্ধি
সবশেষে, জ্ঞান এবং প্রেমের মিলনই হলো মানব জীবনের সার্থকতা। যে ব্যক্তি নিজেকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে—এই অমোঘ সত্যই সকল শাস্ত্রের মূল। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র জিকিরে যখন নফস ফানা হয়ে যায়, তখন কেবল 'তিনিই' অবশিষ্ট থাকেন। দ্বৈততার পর্দা সরে গেলে দেখা যায় যে, স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির থেকে আলাদা নন, বরং অতি নিকটে। এই একাত্মবোধই হলো মারেফতের চূড়ান্ত শিখর।
সামগ্রিক সারসংক্ষেপ: ভোলাই শাহের এই পাণ্ডুলিপিটি মূলত সৃষ্টির আদিকথা থেকে শুরু করে মানুষের আধ্যাত্মিক বিবর্তন, মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা এবং নফস দমনের মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে মিলনের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এটি বাহ্যিক ধর্মের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থ প্রেমকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়।
মনিরুদ্দিন শাহের সংগ্রহ
মনিরুদ্দিন শাহের সংগ্রহ
লালন শাহের প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম মনিরুদ্দিন শাহ। তাঁর সংগৃহীত ও রচিত কালামগুলো মূলত লালন দর্শনের প্রামাণ্য দলিল এবং মারেফতি তত্ত্বের এক অনন্য ভাণ্ডার। নিচে তাঁর সংগ্রহের মূল ভাবধারাগুলো প্রবহমান গদ্যে উপস্থাপন করা হলো:
গুরুর মহিমা ও সত্যের সন্ধান
মনিরুদ্দিন শাহের সংগ্রহে গুরু বা মুর্শিদের স্থান সবার উপরে। তিনি মনে করেন, সত্যের সন্ধান পেতে হলে একজন 'রাহবার' বা পথপ্রদর্শকের বিকল্প নেই। গুরু হলেন সেই দর্পণ, যাতে শিষ্য নিজের স্বরূপ দেখতে পায়। স্রষ্টা নিরাকার হলেও গুরুর সুরতে তিনি শিষ্যের হৃদয়ে প্রকাশিত হন। তাই গুরুর চরণে আত্মসমর্পণ করাই হলো আধ্যাত্মিক সাধনার প্রথম পাঠ। গুরুর বাক্যকে অভ্রান্ত সত্য মেনে চললে তবেই অন্তরের অন্ধকার দূর হয় এবং সত্যের পথ উন্মোচিত হয়।
দেহ-তত্ত্ব ও আরশ-কুরসির রহস্য
এই দেহ কেবল রক্ত-মাংসের খাঁচা নয়, বরং এটিই হলো 'মক্কা' বা 'মদিনা'। মনিরুদ্দিন শাহের দর্শনে, যা আছে এই মহাবিশ্বে, তা-ই আছে এই মানবদেহে। দেহের ভেতরেই সাত আসমান এবং আরশ-কুরসির অবস্থান। ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করে দেহের ঘরটি পবিত্র করতে পারলে সেখানেই পরমাত্মার দর্শন মেলে। তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন যে, যে ব্যক্তি আপন ঘরকে চিনতে পারেনি, সে কখনোই পরওয়ারদেগারকে চিনতে পারবে না। দেহের নবদ্বার বন্ধ করে অন্তরের দুয়ার খোলাই হলো প্রকৃত যোগসাধনা।
জাত-পাতের ঊর্ধ্বে মানবধর্ম
মনিরুদ্দিন শাহের সংগৃহীত গান ও দর্শনে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন মানুষের জাত-পাত এবং বাহ্যিক পরিচয় নিয়ে। মানুষ জন্মগতভাবে কোনো চিহ্ন নিয়ে আসে না, বরং সমাজই তাকে হিন্দু, মুসলিম বা বৌদ্ধ নামে চিহ্নিত করে। তাঁর মতে, সৃষ্টির মূলে সবাই এক এবং অভিন্ন। লালন সাঁইজির মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের পরিচয় তার কর্মে এবং প্রেমে, তার বংশে বা ধর্মে নয়। 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায়'—এই ধ্রুব সত্যই তাঁর সংগ্রহের মূল সুর।
মনের মানুষ ও অলখ সাঁই
হৃদয়ের গভীরে এক 'অচিন পাখি' বা 'মনের মানুষ' বাস করে। তাকে ধরা-ছোঁয়ার অতীত মনে হলেও প্রেমের ফাঁদ পাতলে সে ধরা দেয়। মনিরুদ্দিন শাহ এই অলখ সাঁইকে চেনার জন্য ব্যাকুলতার কথা বলেছেন। জিকির ও ধ্যানের মাধ্যমে যখন মন স্থির হয়, তখনই সেই নূরের ঝলকানি দেখা যায়। এই সাধনপথ অত্যন্ত দুর্গম; অনেকটা চুলের ওপর দিয়ে হাঁটা বা আগুনের নদীতে সাঁতার কাটার মতো। কিন্তু যার অন্তরে খাঁটি ইশক বা প্রেম আছে, তার জন্য এই পথই পরম আনন্দের উৎস।
মনিরুদ্দিন শাহের সংগ্রহে থাকা লালন দর্শনের অত্যন্ত গূঢ় ও গুপ্ত দুটি অধ্যায় হলো চার চন্দ্রভেদ এবং নবনবী তত্ত্ব। ফকিরি সাধনায় এগুলোকে 'মাকামে আসরার' বা রহস্যের স্তর বলা হয়। নিচে এই তত্ত্বদ্বয়ের সারসংক্ষেপ সহজ প্রবাহমান গদ্যে উপস্থাপন করা হলো:
চার চন্দ্রভেদ: দেহের চার গুপ্ত শক্তি
চার চন্দ্রভেদ হলো দেহ-সাধনার এক অতি গোপনীয় পদ্ধতি, যেখানে দেহের চারটি বিশেষ উপাদানকে পবিত্র রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়। সাধকদের মতে, এই চারটি চন্দ্র হলো—শুক্র, শোণিত, মল এবং মূত্র। তবে এগুলোকে কেবল স্থূল পদার্থ হিসেবে দেখলে চলবে না; এগুলোকে সাধনার মাধ্যমে 'স্থির' ও 'শুদ্ধ' করতে হয়।
এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, কামকে প্রেমে রূপান্তর করা। মানুষ সাধারণত এই শক্তিগুলো অপচয় করে ফেলে, কিন্তু কামিল সাধক তার যোগক্রিয়ার মাধ্যমে এই শক্তিকে ঊর্ধ্বগামী করেন। যখন এই চার চন্দ্রের মিলন ঘটে এবং তারা নির্দিষ্ট স্থানে স্থির হয়, তখন দেহের ভেতরে এক দিব্য জ্যোতির প্রকাশ ঘটে। একেই বলা হয় 'অমাবস্যায় পূর্ণিমা দেখা'। এই সাধনায় সফল হলে দেহ জরা-ব্যাধি মুক্ত হয় এবং অমরত্ব বা 'সহজ মানুষ' হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। এটি মূলত নিজের কামনার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এনে আত্মাকে পরমাত্মার সাথে যুক্ত করার এক শারীরিক ও মানসিক প্রক্রিয়া।
নবনবী তত্ত্ব: সৃষ্টির আদি নূর ও নবুওয়াতের ধারা
নবনবী তত্ত্ব হলো সৃষ্টির আদি উৎস এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর নূরের ধারাবাহিক বিবর্তনের এক আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা। এই তত্ত্বে বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহ যখন নিজেকে প্রকাশের ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি নিজের নূর থেকে নূরে মুহাম্মদী সৃষ্টি করেন। এই নূর থেকেই পরবর্তীতে নয়জন প্রধান নবীর মাধ্যমে নবুওয়াতের ধারা পৃথিবীতে প্রকাশিত হয়েছে।
এই নয়জন নবীর (যাঁদের মধ্যে আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা এবং মুহাম্মদ স. প্রধান) প্রত্যেকের মধ্যে সেই একই আদি নূরের বিশেষ বিশেষ গুণের প্রকাশ ঘটেছে। লালন ও মনিরুদ্দিন শাহের মতে, এই নয়জন নবীর শিক্ষা এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক সারসত্তা প্রতিটি মানুষের দেহের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট বা লতিফায় বিদ্যমান। নবনবী তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সত্যের যে প্রবাহ চলছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি একক নূরের বহুমুখী প্রকাশ। এই তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করলে সাধক বুঝতে পারেন যে, নবীগণের আদর্শ কেবল ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের ভেতরেই জীবন্ত হয়ে আছে।
সারসংক্ষেপ: চার চন্দ্রভেদ হলো দেহের জৈবিক শক্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরের পদ্ধতি, আর নবনবী তত্ত্ব হলো সৃষ্টির আদি নূরের বিবর্তন এবং মানুষের ভেতরে তার উপস্থিতির এক গভীর মারেফতি জ্ঞান।
মলম শাহের খাতা
লালন দর্শনের প্রামাণ্য ইতিহাসে মলম শাহের খাতা এক অমূল্য দলিল। লালন সাঁইজির প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম মলম শাহ (বা মলম কারিকর) সাঁইজির মুখনিসৃত বাণী ও গানগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। নিচে এই খাতার মূল আধ্যাত্মিক নির্যাস ও তত্ত্বগুলো প্রবাহমান গদ্যে উপস্থাপন করা হলো:
মউত ও জ্যান্ত মরা তত্ত্ব
মলম শাহের খাতায় 'মউত' বা মৃত্যুকে এক ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু হলো জীবনের অবসান, কিন্তু সাধকের কাছে এটি হলো 'জ্যান্ত মরা'। এর অর্থ হলো, বেঁচে থাকাবস্থায় নিজের আমিত্ব, অহংকার এবং কাম-ক্রোধকে বিসর্জন দেওয়া। যে ব্যক্তি মরার আগে মরতে পারে, তার আর পুনর্জন্মের ভয় থাকে না। এই তত্ত্বে জোর দেওয়া হয়েছে যে, দেহের খাঁচা থেকে প্রাণ পাখি উড়ে যাওয়ার আগেই যেন সাধক নিজের নফসকে (প্রবৃত্তি) জয় করে এক অনন্ত জীবনের সন্ধান পান।
আদম-তত্ত্ব ও নূরের খেলা
আদম (আ.)-এর সৃষ্টির রহস্য মলম শাহের সংগ্রহের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। এখানে আদমকে কেবল মাটির পুতুল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তাকে আল্লাহর নূরের আধার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। স্রষ্টা যখন আদমের দেহে নিজের রুহ ফুঁকে দিলেন, তখনই মানুষ 'আশরাফুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা হওয়ার মর্যাদা পেল। এই নূরের খেলা বোঝার নামই হলো আত্মদর্শন। মলম শাহের লিপিবদ্ধ বাণীগুলো আমাদের শেখায় যে, মানুষের ভেতরেই সেই আদি নূরের জ্যোতি বিদ্যমান, যা চেনার মাধ্যমেই স্রষ্টাকে চেনা সম্ভব।
পাগল মন ও মনের মানুষের ঠিকানা
মানুষের মন এক অস্থির সত্তা, যাকে মলম শাহের খাতায় 'পাগল মন' বা 'অচিন পাখি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মন সারাক্ষণ বিষয়ের টানে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু প্রকৃত 'মনের মানুষ' বা সেই পরম সত্তার বাস এই হৃদয়ের মণিকোঠায়। সাঁইজির বাণীতে ফুটে উঠেছে যে, তীর্থস্থান বা কিতাবের পাতায় খুঁজে তাঁকে পাওয়া যাবে না; বরং অন্তরের আয়না পরিষ্কার করলে সেখানেই তাঁর প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে। এই মনের মানুষকে বশ করাই হলো সাধনার আসল লক্ষ্য।
গোপন ভেদ ও মহাজনি পথ
মলম শাহের সংগৃহীত গানগুলোতে প্রায়শই 'গোপন ভেদ' বা 'গূঢ় কথা'র উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি মূলত গুরু-শিষ্যের মধ্যকার এক আত্মিক যোগাযোগ। মহাজনরা যে পথে হেঁটে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন, সেই পথই হলো প্রকৃত মুক্তির পথ। এখানে বাহ্যিক লৌকিকতার চেয়ে অন্তরের নিষ্ঠাকে বড় করে দেখা হয়েছে। সত্য কথা বলা, পরদ্রব্যে লোভ না করা এবং সৃষ্টির সেবা করার মাধ্যমেই সেই মহাজনি পথে চলা সম্ভব। এই খাতার প্রতিটি ছত্র মানুষকে সরলতা এবং সত্যের দিকে আহ্বান করে।
সারসংক্ষেপ: মলম শাহের খাতা মূলত লালন শাহের আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি আদি রেকর্ড, যা মৃত্যুতত্ত্ব, আদম-তত্ত্ব এবং মনের মানুষের সন্ধানের মাধ্যমে মানুষকে পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক জীবনের পথ দেখায়।