শিবলিঙ্গ খুব ভালো করে দেখুন। নিচে মাতৃ যোনি উপরে শিব লিঙ্গ। মাতৃ যোনির একেবারে তলাটা দেখলে মনে হয় ওটা মাটির ভেতর অনন্তে চলে গেছে। শিব লিঙ্গের ওপরটা অর্ধ-গোলাকার। যেমন আকাশ দেখলে অর্ধগোলাকার মনে হয়। যেন অনন্ত। অর্ধ গোলাকার অন্তততার প্রতীক। সীমাহীন।
অনেকে খুব লজ্জা পায় শিব লিঙ্গ কে শিবের জননাঙ্গ বলতে। কারন তাদের রুচি ও মানষিক স্তরের কারনে।
আসলে পুরটাই উপমা। শিব ও শক্তি। তত্বটা লজ্জা-ঘেন্না, ভাল-মন্দ এসবের উর্দ্ধে। শ্লীল অশ্লীল এসব কিছুর উপরে। অনেক অনেক ওপরে।
অনেকটা সাহসী হতে হবে চিন্তা করতে। নিজেকে শিবের স্থানে নিয়ে গিয়ে বুঝতে হবে। কি ভাবে? মনেহয় এভাবে। চিন্তা করুন।
শিবোহং শিবোহং, শিবোহং শিবোহং, শিবোহং শিবোহং
মনো বুধ্য়হংকার চিত্তানি নাহং
ন চ শ্রোত্র জিহ্বা ন চ ঘ্রাণনেত্রম |
ন চ ব্য়োম ভূমির-ন তেজো ন বায়ুঃ
চিদানংদ রূপঃ শিবোহং শিবোহম || 1 ||
অহং প্রাণ সংজ্ঞো ন বৈপংচ বায়ুঃ
ন বা সপ্তধাতুর-ন বা পংচ কোশাঃ |
নবাক্পাণি পাদৌ ন চোপস্থ পায়ূ
চিদানংদ রূপঃ শিবোহং শিবোহম || 2 ||
ন মে দ্বেষরাগৌ ন মে লোভমোহো
মদো নৈব মে নৈব মাত্সর্য়ভাবঃ |
ন ধর্মো ন চার্ধো ন কামো ন মোক্ষঃ
চিদানংদ রূপঃ শিবোহং শিবোহম || 3 ||
ন পুণ্য়ং ন পাপং ন সৌখ্য়ং ন দুঃখং
ন মন্ত্রো ন তীর্ধং ন বেদা ন য়জ্ঞঃ |
অহং ভোজনং নৈব ভোজ্য়ং ন ভোক্তা
চিদানংদ রূপঃ শিবোহং শিবোহম || 4 ||
অহং নির্বিকল্পো নিরাকার রূপো
বিভূত্বাচ্চ সর্বত্র সর্বেংদ্রিয়াণাম |
ন বা বন্ধনং নৈব মুক্তি ন বংধঃ |
চিদানংদ রূপঃ শিবোহং শিবোহম || 5 ||
ন মৃত্য়ুর-ন শংকা ন মে জাতি ভেদঃ
পিতা নৈব মে নৈব মাতা ন জন্ম |
ন বংধুর-ন মিত্রং গুরুর্নৈব শিষ্য়ঃ
চিদানংদ রূপঃ শিবোহং শিবোহম || 6 ||
শিবোহং শিবোহং, শিবোহং শিবোহং, শিবোহং শিবোহং
রচন: আদি শংকরাচার্য়
বঙ্গানুবাদ:
আমি শিব আমি শিব, আমি শিব আমি শিব, আমি শিব আমি শিব।
আমি মন বুদ্ধি অহংকার বা চিত্ত নই। কর্ণ ও জিহ্বা নই, নাসিকা ও চক্ষু নই। আকাশ ও ক্ষিতি নহি। অগ্নি নহি, বায়ুও নহি। আমি জ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ শিব। আমি ই শিব।
আমি পঞ্চপ্রাণ নহি। পঞ্চবায়ু নহি। সপ্তধাতু নহি। বাগিন্দ্রিয় হস্ত ও পদ নহি। জননইন্দ্রিয় ও মলদ্বার নহি। জ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ শিব আমিই শিব।
আমার অনুরাগ ও বিরাগ নাই। আমার লোভ ও মোহ নাই। আমার অহংকার ও মাৎসর্য নাই। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ নাই। আমি চিদানন্দ স্বরূপ শিব। আমিই শিব।
আমার পাপ পুণ্য সুখ-দুঃখ মন্ত্র তীর্থ বেদ পাঠ ও যজ্ঞ নাই। আমি ভোজন ভোজ্য বা ভোক্তা নই। আমি চিদানন্দ স্বরূপ শিব। আমি শিব।
আমার মৃত্যুর ভয় নেই। জাতিভেদ নেই। আমার পিতা-মাতা ও জন্ম নেই আমার বন্ধু মিত্র গুরু শিষ্য নেই।
আমি নিরবিকল্প নিরাকার স্বরূপ এবং সর্বব্যাপী বলিয়া সর্বত্র বিদ্যমান। আমি ইন্দ্রিয় বর্গের সহিত সংযুক্ত নই। আমি মুক্তি নই। জ্ঞেয়েও নহি। আমি চিদানন্দ স্বরূপ শিব। আমি ই শিব।
আমি শিব আমি শিব, আমি শিব আমি শিব, আমি শিব আমি শিব।
বেশ কঠিন ব্যাপার, তাই না?
শিব ছিলেন অনার্য দেবতা। পশুপতি নামে শিব মহেঞ্জোদার সভ্যার সময় পূজিত ছিলেন। পশুপতি নামে এক উত্থিত লিঙ্গের দেবতার মূর্তি শীল মোহরে খদাই করা পাওয়া গেছে।
আর্যরা প্রথমে শিবকে দেবতা হিসেবে মানতে চায়নি। লিঙ্গ পূজাকে তারা অশ্লীল মনেকরতো। অনার্যদের লিঙ্গ ও যোনি পূজাকে জার্মানীদের ভাই আর্যরা অসভ্যতা বলতো। ভারতের এই আদিবাসীরা আর্যদের কাছে ছিলো অসুর, দৈত্য, রাক্ষস।
পুরণের এক কাহিনীতে আছে বিশিষ্ট বৈদিক ঋষি ভৃগু শিব ও শিব ভক্তদের বৈদিক ধর্ম ত্যাগী বলেন এবং অভিশাপ দেন। অর্থাৎ আর্য সমাজকে শিবতত্বের থেকে দূরে রাখার প্ৰচেষ্টা কম হয়নি। ওদিকে অসুররা শিবের আরাধনা করে অনেক বর ও অস্ত্র লাভ করছে এমন কাহিনীও পূরণে কম নেই।
কিন্তু আগুন চাই চাপা থাকে না। পরবর্তী কালে আর্যরা অনার্যদের মাধ্যমে শিবতত্বের সন্ধান পায় এবং শিবতত্ব স্বীকার করে নেয়। শিব এতটাই জনপ্রিয় যে তিনি আর্য দেবতাদের অতিক্রম করে মহাদেব বিশেষণে ভূষিত হন। কারন, দর্শন উপেক্ষা করার উপায় নেই। সত্যিকে অস্বীকার করে শুধু অজ্ঞানতা।
স্কন্ধ পুরান অনুসারে, শিব নগ্ন হয়ে অর্থাৎ আদিরূপে, ভিক্ষা করতে ঋষিদের আশ্রমে প্রবেশ করতেন। এতে অর্য সভ্যতা রুষ্ঠ হয়। অশ্লীলতার দায়ে। ঋষিরা শিবকে অভিশাপ দেন, তোমার লিঙ্গ খোঁসে মাটিতে পরে যাবে। লিঙ্গ খোসা মাটিতে পড়ে যায়। তখন সেই লিঙ্গ তার সৃষ্ট সমগ্র জগৎকে আবার নিজের মধ্যে সমাহিত করতে থাকে। বিশ্ব সৃষ্টি বিলুপ্তির পথে। ঋষিরা ভয় পেয়ে তাদের দেবতা সৃষ্টি কর্তা প্রজাপতি ব্রমহার কাছে গেলেন। ব্রমহা তখন বিপদের সমাধানে, ওই লিঙ্গের পূজার বিধান দেন।
গল্পের ছলে ইতিহাস লেখা, তাই তো?
ইউরোপের মত না থাকলে লেখা জাত পায়না। তাই বলি। জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট, শিবলিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে শিবলিঙ্গ পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে সৃষ্ট প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন।
শিবলিঙ্গ শিব অর্থাৎ আদি পিতা ও আদি মাতা শক্তির মিলনের মুহূর্ত। এটাতে লজ্জার কিছু নেই। আমার মা বাবা ওই দিন ওই মুহূর্তে যদি যৌন মিলন না করতেন তাহলে আমি সৃষ্টি হতাম না। এই জন্যে মা- বাবাকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করার মুর্খামি আমি করিনা।
শিব লিঙ্গ যদি অশ্লীলতা হয় তাহলে এই গোটা মানব সভ্যতা অশ্লীলতার ফলাফল।
যৌন মিলনের মাধ্যমেই সৃষ্টি সমস্ত প্রাণ। জীব এটাই বোঝে। মানব জীবন সৃষ্টির ক্ষত্রে যৌন মিলন অবসম্ভাবি। আমার মা-বাবা তার মা-বাবা তার মা-বাবা এবং সর্বশেষে সৃষ্টির আদি পুরুষ ও নারী। অস্বীকার কোন যুক্তিতে করবো এবং কেনইবা করবো।
সৃষ্টির সেই আদি মুহূর্তটা কে পূজা করা হয়।
সানি লিওনের পর্নের পর্যায়ে সেটাকে যে নামাতে চায় সেটা তার বেক্তিগত রুচি।
শিবতত্ব একটা আধ্যাত্মিক তত্ব। কোনো ধর্মীয় মতবাদ নয়। আধ্যাত্মিক তত্ব বোঝার ক্ষমতা সবার নেই। তাই সেটাকে সরল করে দেওয়ার জন্যে মহাপুরুষরা সমাজে ধর্ম সংস্থাপন করেছেন যুগে যুগে।
প্রাচীন রোমে ‘প্রায়াপাস’ নামে শিব লিঙ্গের পূজা হতো।
শিবতত্ব বিশ্বে কোনো মহাপুরুষ অস্বীকার করেননি। এমন কি ঘোর মূর্তি পূজার বিরোধী বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাঃ) মুসলিম ধর্ম প্রচারের আগে মক্কার কাবা ঘরে রাখা কালো পাথরের সামনে বসতেন। মুসলিম ধর্মের প্রচারের পর মক্কা লাভ করে উনি কাবা ঘরের সব দেব-দেবীর মূর্তি ধ্বংস করে মহান ইসলাম দর্শন স্থাপন করালেও ওই কালো পাথর ধ্বংস করতে নিষেধ করেন। হাজরে আসওয়াদ নামে কাবার শরীফের দক্ষিণ-পূর্বে ওই পাথরকে সৃষ্টির আদি পিতা মাতা আদম (আঃ) ও হওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা আছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাঃ) 605 সালে এটা নিজের হাতে স্থ্যাপন করেন। হজ করতে এসে ওই কালো পাথরকেও তাওয়াফ ও চুম্বন করার নির্দেশ রসূল (সাঃ) এর মাধ্যমে পবিত্র আসমানী গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন স্বয়ং সর্ব শক্তিমান আল্লাহ তাআলা।
আজও ওই পাথর কাবা ঘরে আছে। হাজী ভাইরা এই বিষয়ে আলোকপাত করুন। হিন্দুদের মধ্যে একমাত্র লোকনাথ ব্রহ্মচারী মক্কায় প্রবেশ করার অধিকার পেয়েছিলেন। উনিও পবিত্র কাবার তৎকালীন প্রধানের কাছে কুরআনের শিক্ষা গ্রহন এবং তাকে হিন্দু দর্শনের শিক্ষা দান করেন।
উচ্চ ইসলামিক জ্ঞান সম্পন্ন আমার ইসলাম দর্শন শিক্ষক এবং আমার হিন্দু দর্শনের শিক্ষক উভয়েই আমাকে এই বিষয়ে এখানে আলোচনা করতে নিষেধ করলেও, কেবল মাত্র উচ্চ স্তরের পাঠকদের জন্য এই লেখা প্রকাশ করলাম। এর পরেও যারা শিব ও শিব লিঙ্গকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করবেন তাদের অনুরোধ শিব তত্বের থেকে দূরে থাকুন। নুনের পুতুলের সমুদ্র মাপার দরকার নেই। কোনো অবান্তর সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।
ছবি গুগুল থেকে নেওয়া






